সূচনা : ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে পরবর্তীকালে কোম্পানির পরিচালক সভা এবং মালিকসহ বিলাতে থেকে ভারতে কোম্পানির কাজকর্ম তাদারকি করত। এই সময় ভারতের কোম্পানির একছত্র আধিপত্যের বিষয় সমালোচনা শুরু হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলাতে পরিচালক সভা ও মালিক সভার অধীন থেকে শাসন পরিচালনা করতে থাকে। কোম্পানি ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের পর বাংলা, মুম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি প্রেসিডেন্সি স্থাপন করে। প্রতিটি প্রেসিডেন্ট টিতে একজন করে গর্ভনর তার অধীনস্থ পরিষদের সহায়তা শাসন পরিচালনা করতে থাকে।
এদের কাজকর্ম দাদার কি করত ইংল্যান্ড অবস্থানকারী কোম্পানির পরিচালক সভা এবং মালিক সভা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ব্রিটিশ বণিককুল, ব্রিটিশ রাজনীতিদ, বুদ্ধিজীবী প্রমুখ ভারতের কোম্পানির একছত্র আধিপত্যের বিরোধী ছিল। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভারত শাসনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থের আমলে প্রবর্তিত রেগুলেটিং অ্যাক্ট বা নিয়ন্ত্রণ আইন যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আইন ১৭৭৩ নামীয় পরিচিত।
রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর শর্তাবলী
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্ট এর প্রধান দুটি দিক হল- ১. ইংল্যান্ডের কোম্পানির পরিচালক সভা সম্পর্কিত দিক, ২. ভারতে কোম্পানির শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কিত দিক।
১. কোম্পানি পরিচালক সভা
বিলাতে কোম্পানির পরিচালক সভা ও মালিক সভায় গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়। আইনে বলা হয় যে-
(১) এখন থেকে ৫০০ পাউন্ড শেয়ারের পরিবর্তে ১০০০ পাউন্ড শেয়ারের মালিকরা বণিক সভায় ভোট নারীর অধিকার পাবে।
(২) পরিচালক সভার সদস্য সংখ্যা হবে ২৪। সদস্যরা চার বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।
(৩) প্রতিবছর ১/৪ অর্থাৎ ৬ জন সদস্য পদত্যাগ করবেন।
(৪) সরকারের অনুমোদন ক্রমে পরিচালক স্বভাব ভারত শাসনের জন্য গর্ব জেনারেল ও তার কাউন্সিলের সদস্যদের নিযুক্ত করবেন।
(৫) পরিচালক সভাপতির ৬ মাস অন্তর ভারত সম্পর্কিত সামরিক, বেসামরিক ও রাজস্ব বিষয়ক তথ্যাদি সরকারকে জানাতে বাধ্য থাকবে।
২. কোম্পানির শাসন ব্যবস্থা
ভারত শাসন এর বিষয়ে রেগুলেটিং অ্যাক্টে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটানো হয়। যেমন-
(১) ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেন্দ্রীয় সরকার বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি নিয়ে গঠিত হয়।
(২) বাংলা প্রেসিডেন্সি গর্ভনর পদের নাম হয় ‘গর্ভনর জেনারেল’ । তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হন। অর্থাৎ তিনি মুম্বাই ও মাদ্রাজে প্রেসিডেন্সির ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার পান। ওয়ারেন হোস্টিং এর ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ও ভারতের প্রথম গর্ভনর জেনারেল নিযুক্ত হন।
(৩) গর্ভনর জেনারেলের অধীনে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি কাউন্সিলিং গঠিত হয়। এই সদস্যরা পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত হন। এই কাউন্সিলের প্রথম চারজন সদস্য ছিলেন ক্লএভআরআং, মনসুন, বারওয়েল এবং ফিলিপ ফ্রান্সিস।
(৪) কাউন্সিলের পরামর্শ ক্রমে গর্ভনর জেনারেল কার্য পরিচালনা করতে এবং সংখ্যা গরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করতেন।
(৫) বাংলার অনুরূপ মুম্বাই ও মাদ্রাস প্রেসিডেন্সিতে একজন করে গর্ভনগর ও চারজন সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিল গঠিত হয়।
(৬) ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে একজন প্রধান বিচারপতি ও তিনজন সাধারণ বিচারপতি নিয়ে কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়। এর প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্যার এলিজা ইম্পএ।
রেগুলেটিং অ্যাক্ট এর মূল্যায়ন
১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্টর বিভিন্ন ত্রুটি বিচ্যুতি এবং গুরুত্ব উভয় ছিল, যেমন-
১. ত্রুটি
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্টের প্রধান ত্রুটি বিচ্যুতি ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতাস নির্দিষ্ট না হওয়ায়, যেমন-
(১) গর্ভনর জেনারেল ও তার কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট হয়নি।
(২) মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির উপরে বাংলার গর্ভনর জেনারেলের ক্ষমতাও সুনির্দিষ্ট হয়নি। ফলে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হয়।
(৩) দেশীয় বিজারয় গুলির ওপর সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় দেশীয় বিচারালয় গুলির ওপরে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে।
(৪) গর্ভনর জেনারেলের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সম্পর্ক সুনির্দিষ্ট না হওয়ার কারণে বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার লড়াই দেখা দেয় এবং প্রশাসনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। বাউটেন রাউস বলেছেন যে, “এই আইনের উদ্দেশ্যে মহৎ ছিল, কিন্তু এটি যে ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছিল তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
২. গুরুত্ব
(১) এই আইনের ওপরে ভিত্তি করে পরবর্তীকালে ইঙ্গ ভারতীয় প্রশাসন গড়ে ওঠে।
(২) সর্বপ্রথম এই আইনের মাধ্যমে ভারতের একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা উদ্যোগ নেয়া হয়।
(৩) এটি হলো ভারতের প্রথম লিখিত আইন যা পূর্বেকার লিখিত ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেয়।
(৪) এই আইনের দাঁড়ায় ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম কোম্পানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগে নেয়। মাইকেল এডওয়ার্ডস বলেন যে, এ আইনের বাণিজ্য শক্তি হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতনের সূচনা করে।
(৫) এই আইনের দ্বারা ভারতের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক শাসনের সূত্রপাত ঘটে।