স্মৃতিকথা সম্বন্ধে আলোচনা করো?

সূচনা : অতীত ঐতিহ্যের কল্পনা ধারায় এক অন্যতম উপাদান হলো স্মৃতিকথা। স্মৃতির ওপরে নির্ভর করে মানুষ অতীতের দিকে পিছিয়ে ফিরে তাকায়। সাধারণভাবে বলা যায় ইতিহাসের যেখানে শেষ, স্মৃতি লিখন সেখান থেকেই পথচলা শুরু করে। অতীতের কোন ব্যক্তি, ঘটনা বা সমষ্টিগত ঘটনা স্মৃতিকথায় পুনরায় ভেসে ওঠে।

স্মৃতিকথার নানাদিক

১. সংজ্ঞা

(১) স্মৃতিচারণগত : সাধারণ অর্থে স্মৃতি কথাগুলি হলো অতীতের স্মৃতিচারণ। যে অ-উপন্যাস ধর্মী সাহিত্যে লেখক অতি জীবন ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা স্মৃতিচারণ করে থাকেন, তাকে স্মৃতি কথা বলা হয়।

(২) অতীত ঘটনার বিবরণ ভিত্তিক : যে লিখিত সাহিত্যে লেখক তার অতীতের ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন বা সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন ঘটনা স্মৃতি বর্ণনা করেন, তাকে স্মৃতিকথা বলা যায়।

(৩) ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ ভিত্তিক : বিগত দিনে ঘটে যাওয়া কোন ঐতিহাসিক ঘটনাকে যখন লেখক তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে তুলে আনে ও তা লিখিত রূপ দেন, তখন তাকে স্মৃতি কথা বলা যেতে পারে।

২. প্রকৃতি

প্রকৃতিগত বিচারের স্মৃতি কথা কে আমরা লৌকিক জ্ঞানও বলতে পারি। ম্যাক্সমুলার যে পুরান নির্ভর লোক ঐতিহ্যের কথা বলেছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে স্মৃতি শাস্ত্র ও সংহিতার মধ্যে প্রাচীন সাহিত্য সৃষ্টি। স্মৃতিকথা অনেক সময় কালে কটিভ মেমরি বা যৌথ স্মৃতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আসলে ৩০০ বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে লোকমুখে প্রচারিত কথাকে কলেকটিভ মেমোরি বা যৌথ স্মৃতি হিসেবে অবহিত করা হয়। স্মৃতিকথাকে লৌকিক জ্ঞান হিসেবে সমর্থনের ব্যাপারে ক্লিফর্ড গিয়রটজ ‘মরাল ইমাজিশন’-এ সামাজিক ইতিহাস রচনায় উল্লেখ করেছেন।

৩. ইতিহাস ও স্মৃতি কথা

ইতিহাস ও স্মৃতিকথার মধ্যে কিছুটা হলেও সম্পর্ক রয়েছে। অতীত দিনের ঘটনা যেমন ইতিহাসের স্থান পায়, তেমন অতীত কাহিনী ও স্মৃতিকথায় স্থান পায়। ইতিহাসে অতীত কাহিনী লিখিত আকারে তথ্যসূত্রসহ উপস্থাপিত হয়। কিন্তু স্মৃতি কথার তথ্যসূত্র ছাড়াই কাহিনীর হুবহু বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক, নিরপেক্ষ, যাচাই করার তথ্যসূত্র স্বাবলম্বিত ঘটনা জায়গা পায়, যা ইতিবাচক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আদলে রচিত হয়। কিন্তু স্মৃতি কথার ক্ষেত্রে যে নিয়মবিধি থাকে না।

৪. বৈশিষ্ট্য

স্মৃতিকথার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো-

(১) বাস্তব অভিজ্ঞতার বিবরণ : স্মৃতিকথা আসলে অতীতে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতার বিবরণ। স্মৃতিকথায় যে কাহিনী বর্ণিত বা পরিবেশিত হয় তা কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিবরণ বলা চলে।

(২) গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উপস্থাপন : স্মৃতিকথায় লেখক এর কলমে তার অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা উঠে আসে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিগত দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর ওপরে আলোকপাত করা হয়।

(৩) বিশেষ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ : স্মৃতিকথায় লেখকের বিগত দিনের ঘটনাবলী সম্পর্কে বিশেষ অনুভূতি বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। দক্ষিণারঞ্জন বসুর লেখা ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ নামের স্মৃতি কথার আমার দেশভাগের ইতিহাস ও যন্ত্রণায় বিশেষ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করে থাকি।

৫. উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্মৃতি কথা

(১) ছেড়ে আশা গ্রাম : দক্ষিণা রঞ্জন বসুর লেখা ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ নামে স্মৃতি কথাই দেশভাগের প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। দেশভাগের পরিণতি উদ্বাস্তু শরণার্থীদের মানসিক যন্ত্রণা, বেদনা ধরা পড়েছে এই উপন্যাস। এই স্মৃতি কথাটির অনুসরণে পরবর্তীকালে বেশ কিছু দেশভাগের ইতিহাস রচিত হয়েছে।

(২) সেদিনের কথা : স্বাধীনতা লাভের পর প্রাক্কালে কলকাতায় সম্প্রদায়িক স্বাধীনতা লাভের পর প্রাক্কালে কলকাতায় সম্প্রদায়িক গঙ্গার দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে মণিকুন্তলা সেনের লেখা তার স্মৃতিকথা ‘সেদিনের কথা’ । এই আত্মকথাই হিন্দু মুসলিম পারস্পরিক হানাহানের নিদারুণ করুন চিত্র ফুটে ওঠে।

(৩) জীবনস্মৃতি : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অতিথী দিনের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থ। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘জীবনস্মৃতি জীবন কথা নয়, স্মৃতিকথা”। এই স্মৃতি কথার বিষয়গুলি ছিল কবির শিক্ষারম্ভ, কবিতা রচনারম্ভ, শিক্ষাজীবন, বাড়ি পরিবেশ, গীত চর্চা, স্বদেশ ভাবনা, পিতৃদেবের প্রসঙ্গ, হিমালয় যাত্রা ও প্রত্যআবর্তন-সহ নানা প্রসঙ্গ। ৪৪ টি পরিচ্ছন্দে কবি জীবনের শুরুর দিকে বিচিত্র স্মৃতিগুলি এই গ্রন্থের স্থান পেয়েছে।।

(৪) দি স্ট্রাগল ইন মাই লাইফ : দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী প্রাণপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা তার বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী জীবন সংগ্রামের স্মৃতি নিয়ে রচনা করেন ‘দিস স্ট্রাগল ইন মাই লাইফ’ নামে গ্রন্থটি। এই স্মৃতি কথাটিতে নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী অপসনের বিরুদ্ধে নিজের এবং নিজে দেশবাসী জীবন সংগ্রামের কাহিনী পরিবেশন করেছেন।

(৫) দি স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ : ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী তার সংগ্রামী জীবনের সত্যাগ্রহ আদর্শ ও তার নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস আন্দোলন গুলির স্মৃতি নিয়ে রচনা করেন এই গ্রন্থটি। এই রন্ধে তিনি সত্যাগ্রহ আদর্শের স্বরূপ উমোচনের পাশাপাশি সত্যাগ্রহ আদর্শ দ্বারা প্রচারিত নানা সংগ্রামের পরিচয় দিয়েছেন।

(৬) ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম : ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আন্দোলন প্রথম শ্রেণীর নেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন ঘটনাবলী তার স্মৃতিপটে তুলে এনে রচনা করেন এই গ্রন্থটি। এই গ্রন্থে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী জাতীয় কংগ্রেস ও জাতীয় নেত্র বর্গের ভূমিকা বর্ণনা ছাড়াও স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন।

৬. গুরুত্ব

(১) বাস্তবতার বিচারে : বাস্তবতায় বিচারের স্মৃতিকথা গুলি যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। স্মৃতি কথা গুলিতে অতীত দিনের বাস্তব ঘটনা বা কাহিনীগুলি সাধারণত পরিবেশিত হয়। তার স্মৃতি কথার মাধ্যমে আমরা বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীত দিনের বাস্তব ঘটনা কে প্রত্যক্ষ করে থাকি।

(২) ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে : স্মৃতিকথা গুলি থেকে অনেক সময় ঐতিহাসিক উপাদানের সংজ্ঞা মেলে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ওপর লেখা বা কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর লেখা স্মৃতিকথাগুলির ইতিহাসের মূল্যবান ঘটনা বলি জানান দেয়।

(৩) প্রত্যক্ষ বিবরণ হিসেবে : অতীত কাহিনী বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গুনী ব্যক্তিগণ স্মৃতিকথায় তাদের অতি স্মৃতিপূর্ণ বর্ণনা করেন। তাই স্মৃতি কথাগুলি হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ বিবরণ ধর্মী ও সুখপাঠ্য।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment