সাম্রাজ্যবাদ উদ্ভবের কারণ গুলি লেখ? সাম্রাজ্যবাদের তাৎপর্য বা পরিণতি লেখ?

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণসমূহ

সাম্রাজ্যবাদ উদ্ভবের একাধিক কারণ রয়েছে। এই সমস্ত কারণগুলি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানান মত ও প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহাসিক জেমস জোল বলেন যে, সম্ভবত কোন একটি অভিমত সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ এর কারণ ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়। এর জন্য বিভিন্ন কারণ কে দায়ী করা যায়। সাম্রাজ্যবাদ উদ্ববের মূল কয়েকটি কারণ হলো –

১. অর্থনৈতিক কারণ

অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার তাগিদে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটেছিল বলা চলে। প্রাচীন রোম বাণিজ্যিক স্বার্থে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। শিল্প বিপ্লবের পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি দেশে বাণিজ্যিক কারণে অর্থাৎ, পণ্য বিক্রির বাজার গড়ে তোলা, কম মূল্যে কাঁচের মান সংগ্রহ, উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগ, শ্রমিক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাণিজ্যিক ঘাঁটি নির্মাণ করে। প্রথমদিকে এই বাণিজ্যিক লক্ষ্য পরবর্তীকালে শাসনগত লক্ষ্যে রূপান্তরিত হলে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে।

অর্থাৎ বাণিজ্যিক লোককে বিভিন্ন দেশ অন্য দেশগুলোতে অনুপ্রবেশ করলে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক অঞ্চল গুলিকে তার নিজের সাম্রাজ্যের অংশ পরিণত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় -ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্য লক্ষ্য নিয়ে ভারত এলেও পরে ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভুক্ত হয়। ক্রমে বণিকদের মানদণ্ড ও রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হয়। কার্ল মার্কস, ভি. আই. লেনিন প্রমুখের ব্যাখ্যা অর্থনীতি স্বার্থকে সাম্রাজ্যবাদী উদ্ভবের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. রাজনৈতিক কারণ

(১) জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা : সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের ক্ষেত্রে জাতিগত প্রাধান্যের ধারণা বিশেষ্য ভাবে দায়ী বলা চলে। হিটলারের মতো রাষ্ট্রনায়কগণ দাবি জানিয়ে বলেন অনার্য জাতির ওপর প্রধান্য বিস্তারের অধিকার রয়েছে আর্য জাতির। শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে নিজে নিজে যাতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। এর ফলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য শুরু হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জার্মানি তরফ থেকে টিউটনিক জাতির, ব্রিটেনের তরফ থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির, সরাসরি তরফ থেকে লাতিন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করা হয়।

(২) রাজনৈতিক দক্ষতা প্রতিষ্ঠা : এক দেশে অন্য দেশের ওপর নিজে নিজে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্যত হলে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে। সুপ্রাচীন কাল থেকেই ক্ষমতা, আধিপত্যের লালসা, পাররাজ্য লুন্ঠনের মনোবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় কোন কোন দেশের সাম্রাজ্য স্থাপনকে জাতীয় দম্ভ বা জাতিগত গৌরব বলে মনে করত। সাধারণত দুর্বল দেশগুলির উপর আর্থিক ও সামরিক দিক থেকে সবল দেশগুলি নিজেদের রাজনৈতিক দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার তথাকথিত দুর্বল দেশ গুলিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি নিজ নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা কায়েম করে। আসলে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও পররাজ্য গ্রাস লুলু পতা সাম্রাজ্যবাদের উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। তাই সুম্যান বলেছেন, ‘সাম্রাজ্যবাদ হল ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং বিজয় স্পৃহার এক অভিব্যক্তি’।

৩. সামাজিক কারণ

(১) উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার পূর্ণবাসন : উনিশ শতক থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যা চাপ বাড়তে থাকে। উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা পূর্ণবাসন এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অনেক সময় কোন দেশে নতুন নতুন ভূখণ্ড দখল করে। জার্মানি, জাপানি ইত্যাদি দেশগুলি উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার পূর্ণবাসনের অজুহাত দেখিয়ে একের পর এক দুর্বল দেশ গুলি দখল নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে।

(২) জাতির নিরাপত্তা রক্ষা : যাদের নিরাপত্তা রক্ষা নামে কোন দেশে নিজ ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে অন্য দেশের দখল নিয়ে বা কোন দেশে নির্দিষ্ট এলাকা নিজের অধিকারে আনলে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স রাইন নদী পর্যন্ত সমগ্র ভূখণ্ডের ওপরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। এর প্রতিক্রিয়া জাতি নিরাপত্তা রক্ষার কারণ দেখে জার্মানি একের পর এক অঞ্চল দখল নেয়। জাতি নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে জাপান সুদূর প্রাচ্যে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তার করে।

৪. অন্যান্য কারণ

(১) ধর্মপ্রচার : অনেক সময় ধর্ম প্রচারের প্রয়াস ও সাম্রাজ্যবাদের উত্থানের পথ প্রস্তুত করেছে। প্রাশ্চাত্য ধারণের বিশ্বাসে অনেকেই মনে করেন খ্রিস্টের পবিত্র বাণী বিচ্ছেদ প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হলো তাদের পবিত্র কর্তব্য।। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি ধর্মযাজকগণ এশিয়া, এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োগ করেন। ধর্মপ্রচারের অন্তরালে তারা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে বজায় রাখার চেষ্টা চালান। প্রোটেস্টান্ট মিশনারিগণ খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে লক্ষ্য নিয়ে আমেরিকায় যান। উদ্যোগ আমেরিকার ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সাহায্য করে। এরকমভাবে এসিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলিতে খ্রিস্টান মিশনারীগণ খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের ঔ নামে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার পথ প্রস্তুত করে দেন।

(২) সংস্কৃতির কারণ : অনেক সময় পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া অংশ সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলো পৌঁছে দেওয়ার বাণী শুনিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপ্রোষকেরা সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ও প্রসারণ ঘটান। ব্রিটিশ কবি কিপলিং এ প্রসঙ্গে বলেছেন- “পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া অংশে সভ্যতার আলো কবির্তিকা পৌঁছে দেওয় শ্বেতকায় জাতির দায়িত্ব।” মার্কিন সিনেটর অ্যালবার্ট রিভারিস এ প্রসঙ্গে বলেছেন – “বর্বর মানুষের মধ্যে সরকার গঠনের দায়িত্ব ঈশ্বর মার্কিনদের ওপর ন্যস্ত করেছেন।”

সাম্রাজ্যবাদের তাৎপর্য/পরিণতি

ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূর প্রসারী।

১. সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রসার

ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলি এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ে তুলে ইউরোপীয় সভ্যতার সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়েছিল। এশিয়া এবং আফ্রিকা গড়ে ওঠা ইউরোপীয় উপনিবেশ গুলির মধ্যে ভারত, চীন এবং মিশরীয়দের প্রাচীন সংস্কৃতি ঐতিহ্য অটুট ছিল। এই তিনটি অঞ্চলে বাদে এসে এবং আফ্রিকা উপনিবেশিক অঞ্চল গুলি ইউরোপীয় সভ্যতা এবং সংস্কৃতির দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। যদিও বিপরীত দিক থেকে উপনিবেশিক দেশ বলে সংস্কৃতি ভালো দিকগুলি ইউরোপীয়রা অনুকরণ করেছিল।

২. আর্থিক শোষণ

শিল্প বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পর মূলত ইউরোপীয় দেশগুলি উপনিবেশিক গঠনের জন্য তোড়জোর শুরু করে দেয়। কে কত শঙ্খ গোপোনিবেশ নিজের দখলে রেখে বিশ্ব শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য ছিল উপনিবেশ গুলির থেকে শিল্প প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা এবং ঔপনিবেশ গুলো বাজারের উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্য বিক্রি করা। এছাড়াও ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তি গুলি উপনিবেশী গুলি থেকে অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন এবং শোষণ করতে শুরু করে। অনেক সময় উপনিবেশ গুলিতে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে কম মজুরি বিনিময় শিল্পজাত পণ্য উৎপাদিত ও বিক্রি দ্বারা অধিক মুনাফা অর্জন করা হতো।

৩. উপনিবেশিক সংঘাত

ইউরোপীয় দেশগুলো ঔপনিবেশ সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। উপনিবেশিক দখল কে কেন্দ্র করে মধ্যে এশিয়াতে ইঙ্গো রুশো প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র রূপ নেয়। সুদুর কাছে জাপান সৌভিয়েত অগ্রগতি রোধ করতে গেলে রুশ ও জাপান দ্বন্দ্বে বাধে। মিশর এবং সুনাম দখল কে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে, মরক্কো কে কেন্দ্র করে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে, টিউনিস অঞ্চলের দখল নিয়ে ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে বিবাদ বাঁধে।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment