সূচনা : ব্রিটিশ ভারতের কিছু অংশ রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমির কৃষকদের থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো। এমনকি চাষের অযোগ্য জমি থেকেও কর আদায় করা হতো। এই রাজস্ব সরাসরি ভাবে আদায় করা হতো রায়ত বা জমির কৃষকদের থেকে। এই বন্দোবস্তই রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত নামেই পরিচিতি। ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার রিট ও স্যার টমাস মনরো উদ্দেশ্যে ১৮০০ কুড়ি খ্রিস্টাব্দের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির কিছু অঞ্চল বাদে ভারতের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে রায়তওয়ারি ব্যবস্থা নেমে এক ধরনের ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়। টমাস মনরোকে এই ব্যবস্থার জনক বলা হয়।
রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত বৈশিষ্ট্য
রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় রায়তকে জমিতে স্থায়ী অধিকার না দিয়ে তাকে ৩০/৪০ বছরে দীর্ঘমেয়াদি শর্তে জমি বন্দোবস্ত দেয়া হত। এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল-
১. মধ্যস্বত্বভোগীর অনুপস্থিতি
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। ফলে সরকার ও কৃষকের মাঝখানে কোন জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগীর শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিলনা।
২. জমির শ্রেণীবিভাগ
রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় জমি জরিপ করে কৃষকদের জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং উৎপাদনের ভিত্তিতে জমি নয়টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়।
৩. জমির মালিকানা
এই ব্যবস্থায় কৃষকদের হাতে জমির মালিকানার অধিকার দেয়া হয়নি। জমি সম্পূর্ণ মালিকানা ছিল সরকারের হাতে। কৃষক শুধু জমি ভোগ করতে পারত।
৪. রাজস্বের হার
রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় রাজস্ব হরের হার খুব বেশি ছিল না এবং সাধারণত 30 বছর পর পর এর হারের পরিবর্তন করা হতো।
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। এই ব্যবস্থাই সুফল ও কুফল উভয়ই লক্ষ্য করা যায়।
সুফল
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে বিভিন্ন সুফল লক্ষ্য করা যায়, যেমন-
১. জটিলতা হ্রাস
রায়তওয়ারি বন্ধ অবস্থায় সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ করে ওঠার প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পায় এবং জমি সংক্রান্ত ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে।
২. শোষণ হ্রাস
মধ্যস্বত্বভোগীর অস্তিত্ব না থাকা এই ব্যবস্থা কৃষকরা শোষণ অত্যাচারের হাত থেকে যথেষ্ট মুক্তি পায়।
৩. উচ্ছেদের আশঙ্কা হ্রাস
এই ব্যবসায় জমিদার জমি থেকে ইচ্ছামতো কৃষকের উচ্ছেদ করতে পারত না। ফলে কৃষকের জীবন জীবিকার নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।
৪. ভূমিদাসপ্রথার অবসান
এই ব্যবস্থা অধিকাংশ কৃষকের ভূমিদাস রাখার ক্ষমতা ছিল না। ফলে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটে।
কুফল
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সুফল বলেছে কুফল গুলি বেশি লক্ষ্য করা যায়, যেমন –
১. সরকারি অত্যাচার
রায়তওয়ারি ব্যবস্থা কৃষকরা কালক্রমে রাষ্ট্র তথা সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচারের শিকার হন। তারা রায়তের অবস্থা সাম্প্রতিক ক্রওক করে তাকে জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারতো। ঐতিহাসিক ডক্টর তারা চাঁদের মতে, এই ব্যবস্থাই প্রজারা বহু জমিদারের পরিবর্তে এক বিরাট জমিদার বা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে।
২. ভাড়াটে প্রজা
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো স্থায়ী রাজ্যস্বরে রাজস্ব দিলে তাকে জমি থেকে উৎখাত করা হতো। ডক্টর বিপন চন্দ্রের মতে, জমিতে কৃষকের মালিকানা কার্যকর হয়নি। এই ব্যবস্থায় জমিতে কৃষকের মালিকানা না থাকায় কৃষক কোম্পানির ভাড়াটে প্রজায় পরিণত হয়। সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, সরকার রাজস্ব হিসেবে বা আদায় করেন তা খাজনা নয়, ভাড়া।
৩. রাজস্বের বোঝা
রায়তওয়ারি ব্যবস্থা রাজেশ্বরের হার খুব বেশি ছিল না যা পরিশোধের সামর্থ্য ও তাদের ছিল না। উৎপন্ন ফসলের শতকরা ৪৫ থেকে ৫৫ ভাগ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো। তাছাড়া সরকার ইচ্ছা করলে ২০ বা ৩০ বছর পরপর রাজস্তরের হার বৃদ্ধি করতে পারত।
৪. প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দুর্দশা
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফসল হানি ঘটলেও রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় কৃষকরা রাজস্ব প্রদানে বাধ্য ছিল না। তাছাড়া কোম্পানি রায়তকে রুপার মুদ্রার আদর্শ প্রদানের নির্দেশন দিলে রাজস্ব মেটাতে গিয়ে কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদের ঋণ নিতে বাধ্য হত।
উপসংহার
রমেশ চন্দ্র দত্ত বলেছেন যে, এই ব্যবস্থায় শোষণের তীব্রতা অনেক বেশি ছিল এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের চেয়ে তা অধিকতর ক্ষতিকর ছিল। সরকারি আমনার এই ব্যবস্থা কৃষকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জমি থেকে তাকে উচ্ছেদ করতে পারতো। জমির অস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল জনসাধারণের দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ