সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত হবসনের মত
ভূমিকা
সাম্রাজ্যবাদ একটি বহু নিন্দিত বিকৃত ধারণা হলেও ইতিহাস এটি একটি বহু চর্চিত ও আলোচিত বিষয়। বিশেষত মার্কসীয় তত্ত্বের আলোকে সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখ্যা আধুনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ’ ও ‘নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদ’ -এর প্রসারের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে অনেকে মনে করেন। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত হবসনের তত্ত্বের সবিশেষ মূল্য রয়েছে।
১. উৎস
উদারনৈতিক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ তথা ঐতিহাসিক জে. এ. হবসন তার সাম্রাজ্যবাদ একটি পাঠ (Imperialism a Study) গ্রন্থে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের সাম্রাজ্যবাদের সম্বন্ধে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
২. বক্তব্য
হবসন তার ‘সাম্রাজ্যবাদ একটি সমীক্ষা’ (Imperialism a Study) গ্রন্থে বলেছেন যে নয়া সাম্রাজ্যবাদের পিছনে কোন মহৎ ও উচ্চতর লক্ষ্য বা আদর্শ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদের মূল শিখন হলো উদ্বৃত্ত পুঁজিবি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ ছিল পশ্চিম শিল্প উন্নত দেশ বলিতে বিকশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বাভাবিক পরিণতি। হবসন তার সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বে বলেছেন, পুঁজিবাদ বন্ধন ব্যবস্থা ত্রুটির জন্য সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে। অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বন্ধন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারলে সাম্রাজ্যবাদ হবে না। হবসন বলেছেন, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা পুঁজিপত্রীরা অধিক মুনাফা অর্জন করে মূলধন সঞ্চয় করে। অতিরিক্ত মুনাফা দরুন মূলধনের পরিমাণ বাড়ে। এই বারটি মূলধন উপনিবেশে নতুন শিল্পের লগ্নীর জন্য মূলধনীরা নিজের দেশের সরকারকে চাপ দেয়, আর তখনই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উপনিবেশ দখলের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের সূচনা করে।
৩. মতের ব্যাখ্যা
(১) বাড়তি মূলধনের চাপের কারণে সাম্রাজ্য বা উপনিবেশ গড়ে ওঠে। মূলধনীর শ্রেণী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পুঁজি অন্যত্র বিনিয়োগের জন্য সচেষ্ট হয়। তারা নিজেও রাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা নিতে বাধ্য করায়।
(২) উপনিবেশের কাঁচামাল ও বাজারের একচেটিয়া দখল নিয়ে মূলধনী শ্রেণী নিজেদের দেশের শিল্পের প্রসার ঘটাতে এবং উৎপাদিত শিল্পদ্রব্য অনুন্নত দেশগুলিতে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করত।
(৩) ধন বন্টন নীতি মেনে মূলধনী শ্রেণির বাড়তি মূলধন দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করলে বা সমাজের উন্নয়নশীল কাজে মূলধনের বিনিয়োগ ঘটালে সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্টির জন্য বাড়তি চাপকে আটকানো যাবে না।
৪. সমালোচনা
সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত হবসনের তত্ত্বটি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচিত হয়েছে।
প্রথমত, ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পর শিল্প মালিকদের মূলধনস্ফীত হয়ে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটায় হবসনের এই মত সঠিক নয়। কারণ শিল্প বিপ্লবের আগে যুগে ও সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্ব ছিল।
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পথ প্রস্তুত করে। হবসনের এই মতো যথার্থ নয়।
মন্তব্য
হবসনের সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্ব ত্রুটিপূর্ণ হলেও এর ঐতিহাসিক মূল্যকে অস্বীকার করা যায় না। সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখা হিসেবে এই তথ্য নতুন দিগন্তরে উন্মোচন করে। মূলধনী শ্রেণীর অতিরিক্ত মূলধনের সঞ্চয় এবং বাজার দখলের প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষাপট রচনায় সাহায্য করেছিল।
সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তত্ত্ব
মার্কসীয় তত্ত্বের আলোকে সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখ্যা আধুনিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তত্ত্বের সবিশেষ মূল্য রয়েছে।
১. উদ্ভব
আধুনিককালে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালের মতো দেশগুলি আগ্রাসন মূলক বিদেশী নীতির পরিণতি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের পুনরুত্থান ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এই সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তথ্য প্রচারিত হয়।
২. প্রবক্তা
ইতিপূর্বে লেনিন, অপশন প্রমুখ মার্কসীয় ভাবনার আলোকে সাম্রাজ্যবাদের যে তথ্য পেশ করেছিল তার পরিপেক্ষিতে কয়েকজন আধুনিক ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তথ্য প্রচার করেন। সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তত্ত্বের এই মুখ্য প্রবক্তা হলেন ফ্রাঙ্ক এবং ওয়ালার স্টিন।
৩. মূল বক্তব্য
এই বিকল্প তথ্য অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদ হল আন্তর্জাতিক অসামান্য ও শোষণের এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। শিল্প বিপ্লবের ফলে বিশ্বে শিল্প উন্নত এবং অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে আর্থিক বৈষম্য দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই বৈষ্ণব বেড়ে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি উপনিবেশিক শ্রেণী স্বার্থের শোষণ করে চলেছে। এই বৈষ্ণব ও শোষণ মূলক ভূমিকা স্বতন্ত্র ও বা পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটিয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদকে সুদৃঢ় করেছে।
৪. ব্যাখ্যা
(১) বিশ্বের শিল্প উন্নত অঞ্চল গুলি শিল্পে অনুন্নত অঞ্চল গুলিকে শোষণ করে চলেছে।
(২) এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, সস্তা স্বম এবং রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় দেশগুলিকে সাম্রাজ্য বিস্তারে আকৃষ্ট করে।
(৩) সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প তথ্য হিসাবে বেকার, আইনস্টাইন প্রমো উল্লিখিত Devil তাতে বলা হয়েছে বেসরকারি অস্ত্র উৎপাদক গণ আধুনিক মুনাফার লোভে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের সাহায্য করে থাকে।
(৪) সাম্রাজ্যবাদ বিকল্প তথ্য হিসেবে বাস্তববাদী তত্ত্বে বলা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের মূল উৎস হলো জাতীয় রাষ্ট্র গুলির আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।