ভূমিকা
বিশ্ব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হলো সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব, প্রসার, প্রকৃতি এবং পরিণতি সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য নির্ভর এবং যুক্তি-নিষ্ঠ আলোচনা রয়েছে। এই সমস্ত আলোচনার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের মার্কসীয় তত্ত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদের মাংস তত্ত্বের মধ্যে বিখ্যাত রুশো কমিউনিস্ট নেতা লেনিন এবং হবসনের ভাষ্য বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদের মার্কসীয় তথ্য সম্পর্কিত লেনিনের মত
১. উৎস
ভি. আই. লেনিন তার সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে (Imperialism, the Highest Stage of Capitalism’) গ্রন্থ সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত এবং পরিণত আলোচনা করেছে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। এই রন্ধে লেলিন সাম্রাজ্যবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ আখ্যা দেন। লেলিন বলেন সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের চরম পর্যায়ে।
২. বক্তব্য
লেনিনের ধারনায় ধনতন্ত্র ও বা পুঁজিবাদের ভিতর সাম্রাজ্যবাদের বীজ লুকিয়ে রয়েছে। তারমধ্যে পুঁজিবাদের জঠরে সাম্রাজ্যবাদের জন্ম পুঁজিবাদী। দেশগুলি বিদেশি নীতি পুঁজিবাদ শ্রেণীর স্বার্থে পরিচালিত হয়। অধিক মুনাফার লাভের শিল্প মালিকরা দেশবাসী চাহিদা অপেক্ষা অনেক বেশি উৎপাদন করে। এই বাড়তি পণ্য বিক্রি এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সস্তায় পাওয়ার জন্য পুঁজিবাদী দেশগুলি উপনিবেশ দখল করে এবং সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করে। ধনী বুজওয়ারা উপনিবেশের দরিদ্র শ্রমিকদের ওপর শাসন চালায় এবং শোষণ করে। এই শোষিত সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী দেশের জনগণ ভোগ করেন।
৩. মতের ব্যাখ্যা
সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত লেনিনের মতকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-
(১) নতুন বাজারও নতুন উপনিবেশ দখল উভয়ের সাম্রাজ্যবাদীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত পুঁজির বিনিয়োগ ঘটি অতিরিক্ত মুনাফা লাভে উপনিবেশ দখলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
(২) পুঁজিবাদী দেশগুলি অন্যান্য স্বার্থ ভুলে মুনাফা এবং আরও বেশি মুনাফার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর পরিণাম হিসেবে পুঁজিবাদী অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দেয়। পুঁজিবাদী শ্রেণীর স্বার্থে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি পরিচালিত হয়।
(৩) নতুন উপনিবেশ দখলের উপর উপনিবেশক শক্তি নিজের দেশ শ্রমিক অপেক্ষা দখলকারী দেশের শ্রমিকদের শোষণ করা অনেক সুবিধা জনক ও লাভ জনক বলে মনে করে।
(৪) দখলকারী দেশে পুঁজি বিনিয়োগ ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অনেক বেশি মুনাফ অর্জন করে এবং সেখানকার নতুন শ্রমিক শ্রেণীর ওপরে সীমাহীন শোষণ চালায়। এই উদ্বৃত্ত মুনাফার একাংশ পুঁজিবাদী দেশে শ্রমিকদের মধ্যে বন্টিত হয়। এই ফলস্রতিতে শ্রমিক শ্রেণীর অভিজাত ও শোষিত এই দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এই অভিজাত শ্রমিক শ্রেণী শ্রম িক বিপ্লবের কথা ভুলে গিয়ে বুর্জোয়াদের সমর্থন করে।
৪. প্রকৃতি
লেলিন সাম্রাজ্যের তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল-
(১) একচেটিয়া পুঁজিবাদ : লেনিনের মতে, শিল্পের উৎপাদক এবং পুঁজির কেন্দ্রীয় ভবন এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছে যায় ফলে একচেটিয়া কর্তৃত্বের উদ্ভব ঘটে। লেনিনের মতে পুঁজিবাদী অর্থনীতি হল যুদ্ধের জন্মদাতা। লেনিন এ ক্ষেত্রে পাঁচটি আর্থিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল – (i) একচেটিয়া পুঁজিবাদ অবাধ প্রতিযোগিতার অবসান ঘটায় এবং একক কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা করে।
(ii) পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৃহৎ শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেমনভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প ধ্বংস হয়ে যায় ঠিক তেমনভাবেই বৃহৎ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যঙ্গুলী ধ্বংস হয় ও ব্যাংক পুজির কেন্দ্রীকরণ ঘটে। (iii) পুঁজিবাদের বিকাশের সুবাদে ধীরে ধীরে গুটি কয়েক সাম্রাজ্যবাদী দেশের হাতে প্রচুর পুঁজি জমতে থাকে। এই উদ্বৃত্ত পুঁজির নিজের অধীনস্থ দেশগুলোতে দু’ভাগে ভাগ করা যায়, যথা -উৎপাদনশীল পুঁজি হিসাবে এবং ঋণ পুঁজি হিসেবে। (iv) পুঁজিবাদী দেশগুলি প্রকৃত অর্থে বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। লেনিনের মতে , “পুঁজিবাদী গোষ্ঠীগুলি বিশ্ব বাজার কে ভাগ করে নেওয়ার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র একচেটিয়া পুঁজিবাদী জোট গড়ে ওঠে।
(২) ক্ষয়িষু পুঁজিবাদ : সুজি পতিরা যখন দেখেন যে বাজারের উপর তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে তখন তারা অধিক মুনাফার জন্য অর্থ খরচ করেন না। অর্থাৎ এক চেরিয়ার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মুনাফা বৃদ্ধি অনেক সহজ হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদের এই পর্যায়ে হল ক্ষয়িষু পুঁজিবাদ।
(৩) মৃত প্রায় পুঁজিবাদী : ক্ষয়িষু পুঁজি বাদে যখন সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটে তখন পুঁজিবাদ মৃত প্রায়ই হয়ে পড়ে। এই পর্যায়ে পুঁজিবাদের সম্পূর্ণ পতন ঘটে এবং বিপ্লব সংঘটিত হয়।
৫. সমালোচনা
সাম্রাজ্যবাদের প্রসারে শিল্প উন্নত ও পুঁজিবাদী দেশগুলি করতে কাঁচামাল সংগ্রহ, বাজার দখল, পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান প্রভৃতি বিষয়গুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু তা সত্বেও লেনিনের সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্ব বহু দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে।
প্রথমত, লেলিনের ধারণায় পুঁজিবাদী অর্থনীতির উদ্ভব ও বিকাশের ফলে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে। কিন্তু পুঁজিবাদ উদ্ভবের আগে, সরস থেকে অষ্টাদশ শতকের মাধ্যমে সময়কালে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল যে সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে সেগুলো ব্যাখ্যা লেনিনের ভাষ্যে মেলেনা।
দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কের লেনিনের ব্যাখ্যা মূলত পুঁজিবাদ অর্থনীতির বিশ্লেষণের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশের বিদেশনীতির আলোচনার মাধ্যমে লেনিন তার এই ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি।
তৃতীয়ত, লেনিন বলেছেন পুঁজি প্রতি শ্রেণীর নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সাম্রাজ্য স্থাপন করেন বা সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেন। কিন্তু লেনিনের এই যুক্তি ঠিক নয় কেননা বিশ্বের সমস্ত পুঁজিবাদী দেশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেছেন এমন উদাহরণ নেই। উদ্বৃত্ত পুঁজি সমগ্র অংশ এশিয়া বা আফ্রিকার উপনিবেশ গুলিতে লগ্নী করা হয়নি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি সাম্রাজ্য বাড়ির দেশ গুলি তাদের মূলধনের বেশিরভাগটাই রাশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বিনিয়োগ হয়েছিল, যেগুলি তাদের উপনিবেশ ছিল না। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগের উদ্দেশ্যই সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটেনি।
চতুর্থত, লেনিনের ধারণায় পুঁজিবাদের সরকারকে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে।। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বে এই নীতি এখন আর কার্যকরী নয়। বর্তমানে একটি মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ডেভিড টমসন সাম্রাজ্যবাদের প্রসারে প্রদত্ত লেনিনের তত্ত্বকে মৌলিক ও সম্পূর্ণ বলে মনে করেন না। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লেনিন এর সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বের নতুন কোন মূল্যায়ন প্রয়োজন।