ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসারে ইঙ্গ শিখ দ্বন্দ্বের পরিচয় দাও?

সূচনা : গুরু গোবিন্দ সিংহ সর্বপ্রথম খোলসা বাহিনী গড়ে তুলে শিখদের ঐক্যবদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে রনজিৎ সিংহ শিখ মিশরগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে পাঞ্জাবের বৃহত্তম অংশ জুড়ে শিখ রাজ্য গঠন করেন। রনজিত সিং এর আঙুল থেকে মূলত শিখ সম্পর্ক গড়ে তোলে। সুচতুর ইংরেজরা ভারতের অঞ্চলের মতো পাঞ্জাবকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভূক্ত করার উদ্যোগ নেই।

ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসারের ইঙ্গ-শিখ দ্বন্দ্ব

রনজিৎ সিং এর সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্ক

১. সম্পর্কের সূচনা

ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছে যখন মারাঠা, মহীশূর সহ দেশের রাজ্যগুলি একে একে আত্মসমর্পণ করেছেন, সে সময় রনজিৎ সিং শিখ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ব্রিটিশ প্রভাব মুক্ত করার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষ ও রক্তপাত এগিয়ে তিনি ব্রিটিশের সঙ্গে সৌহার্দ্য মূলক সম্পর্ক গড়ে তুলে শিখ শক্তির অগ্রগতিতে প্রচেষ্টা থাকেন। রনজিত সিং অমৃতসর দখল ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে করার পর শতদ্রউ নদীর পশ্চিম তীরে শিখ মিসল গুলি একে একে দখল করেন। রনজিতের এই অগ্রগতির ভীতি হয়ে ইংরেজের ইউসুফ আলীকে লাহোরের রণজিৎ সিং এর দরবারে পাঠিয়ে সম্মান জানায়।

২. সম্পর্কের অগ্রগতি

(১) মিন্টোর সময়কালে অমৃতসরের সন্ধি : রনজিত শতদ্রউ নদীর পূর্ব তীরে রাজ্যগুলি জয় করার লক্ষ্যে অভিযান শুরু করেন। প্রথমে তিনি লুধিয়ানা দখল করেন। এভাবে রনজিতের নেতৃত্বে শিখশক্তির অগ্রগতিতে শঙ্কিত হয়ে গর্ভনর জেনারেল লর্ড মিন্টো রনজিত সিং এর সঙ্গে দৌত্য স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

বড়লাট মিন্টোর দূত হিসেবে চার্লস মেটকাফ লাহোরের রণজিৎ সিং এর দরবারে আসেন ওর রণজিৎ সিং এর সঙ্গে অমৃতসরের সন্ধি ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধির শর্তানুযায়ী – (i) শতদ্রু নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত রনজিৎ সিং এর রাজ্য সীমানার দক্ষিণ সীমান্ত নির্দিষ্ট হয়। (ii) শতদ্রু নদীর পূর্ব তিনের শিখ মিসলগুলি ইংরেজের আনুগত্য স্বীকার করলে সেখানে ইংরেজ সৈন্য মোতায়েনে করা হয়।

(iii) চুক্তিবদ্ধ দুই পক্ষ একে অপরের সঙ্গে স্থায়ী মৈত্রী বজায় রাখবে বলে স্থির হয়।(iv) শতদ্রু নদীর উত্তর দিকে কোম্পানি হস্তক্ষেপ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। অমৃতসরের সন্ধি ইংরেজদের কূটনৈতিক সাফল্য এবং রনজিৎ সিংহের চরম ব্যর্থতার অন্যতম দৃষ্টান্ত। এই সন্ধির দ্বারা ইংরেজ বিনা যুদ্ধে শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী শিখ রাজ্যগুলির ওপর আধিপত্য স্থাপনের সক্ষম হয়। ডক্টর নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিনহা তাই বলেছেন -“এই চুক্তিতে ইংরেজ ছিল আশ্বারোহী আর রনজিৎ সিং ছিলেন অশ্ব।”

(২) আলময়রার সময়কাল : অমৃত সেন এর সন্ধির পর রনজিত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েন। রনজিতের অখিল শিখ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হলেও রণজিৎ নিশ্চিষ্ট থাকেন নি। তিনি নতুন উদ্যমে পুনরায় রাজ্য বিস্তারের মনোযোগী হন। রনজিত একে একে কাংড়া ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে, আর্কট ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে, কোহিনুর ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে, মুলতান ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে, কাশ্মীর ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে, পেশোয়ার ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে দখল করে শিখ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

(৩) আমহার্স্টের সময়কাল : আমহার্স্টের আমলে উভয়পক্ষ কুটনৈতিক পর্যায়ে দূত বিনিময় হয়। এ সময় ইংরেজদের সঙ্গে রণজিতের নেতৃত্ব শিখ শক্তি সম্পর্কে উন্নতি ঘটে।

(৪) বেন্টিকের সময়কাল : ১৮২৮ থেকে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সময়কালে আপাতভাবে ইংরেজদের সঙ্গে রনজিৎ সিং এর সদ্ভাব রয়েছে বলে মনে হলেও অভন তরীর দিক থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে মন কষাকষি শুরু হয়। সিন্ধু দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে গর্ভনর জেনারেল বেন্টিঙ্ক রনজিতের দরবারে কূটনৈতিক দূত হিসেবে আলেকজান্ডার বার্নেসকে পাঠান। ইতিমধ্যে রাশিয়া প্যারেজে প্রাধান্য বিস্তার শুরু করলে ইংরেজরা ভারতে নিরাপত্তা সম্পর্কে উদবিগ্ন হয়ে ওঠে। রনজিতের সাহায্য লাভের জন্য উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক নিজে লাহোরে আসেন। বেন্টিঙ্ক ও রনজিত সিং এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় চিরস্থায়ী মিত্রতা চুক্তি ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে।

(৫) অকল্যান্ড সময়কাল : ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে অকল্যান্ড ভারতের গভর্নর জেনারেল হন। তিনি আফগানিস্তানের রুশো হস্তক্ষেপের সম্ভাবনায় বিচলিত হয়ে পড়েন। তৎকালীন আফগান অধিপতি দোস্ত মোহাম্মদ খানের সঙ্গে ব্রিটিশ সম্পর্কে অবহিত করলে অকল্যান্ড পূর্বতন আফগান অধিপত্য শাহসুজাকে কাবুলের সিংহাসনে বসানো সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে বড়লাট অকল্যান্ড, শাহসুজা ও রনজিত সিংহাসনের মধ্যে ত্রিশক্তি চুক্তি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয়।

৩. ইংরেজর ও রনজিত সিংহের সম্পর্কেবেন্টিঙ্ক অবসান

ত্রিশক্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরে ইংরেজ বাহিনী কাবুল অভিযান শুরু করে। রনজিত এই অভিযানকে সক্রিয়ভাবে সেনাকে কাবুল যাওয়ার পথ দেননি। প্রথম ইঙ্গ আফগান যুদ্ধ চলাকালীন ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে রনজিতের মৃত্যু ঘটলে ইংরেজদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবসান ঘটে।

ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ

১. প্রথম ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ

(১) প্রেক্ষাপট : রনজিত সিংহের মৃত্যুর পর শিক রাজ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগ বাঁধে। খসলা দরবারে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। খোসলা বাহিনীর ঔদ্ধত্য বাড়ে। শিখনের রাজা মাতা ঝিন্দন খোলসা বিরোধী মনোভাব দেখান। এই সুযোগে ইংরেজ পাঞ্জাব দখলের প্রস্তুতি শুরু করেন।

(২) যুদ্ধের সূচনা : এদিকে রাজমাতা ঝিন্দরের প্ররোচনায় বাহিনী শতদ্রুর ওপারের ব্রিটিশ রাজ্য আক্রমণ করে। বড়লাট হার্ডিঞ্জ অমৃতসরের সন্ধি ভঙ্গের অভিযোগ এনে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। শুরু ওই প্রথম ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ।

(৩) সন্ধি : যুদ্ধে জয়ী হয়ে ব্রিটিশ সেনাদল লাহোরের দখল নেই। ফলের শিখরা ইংরেজদের সঙ্গে পরপর লাহোরের প্রথম ও দ্বিতীয় সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হয় ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে।

২. দ্বিতীয় ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ

(১) প্রেক্ষাপট : শিখরা অপমানজনক লাহোরের সন্ধির দুটি মেনে নিতে পারেনি। ইংরেজ রেসিডেন্ট হেনরি লরেন্স রাজ মাতা ঝিন্দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ায় অভিযোগ এনে চুনার দুর্গ থেকে তাকে নির্বাসিত করে। এছাড়াও লরেন্সের পাঞ্জাবের মুলতানের শাসনকর্তা মূলরাজারে কাছে ৭৫ লক্ষ টাকা দাবি করেন। এই দাবি না মানায় মূল রাজাকে সরিয়ে দিয়ে মান সিংহাসন কে মুলতানের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শিখরা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়।

(২) যুদ্ধের সূচনা : বিক্ষুব্ধ শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গে আফগানিস্তানের আমির দোস্ত মোহাম্মদ জোট বাঁধলে শুরু হয় দ্বিতীয় ইঙ্গ শিখ যুদ্ধ।

ইংরেজদের পাঞ্জাব জয়

১. যোগ্য নেতৃত্বের অভাব

দ্বিতীয় ইন্দুর সিক্স যুদ্ধের জয় এর পর ডালহৌসি এক ঘোষণার দ্বারা পাঞ্জাবকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেয় ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে। পাঞ্জাব জয় করার ফলে ভারতে ইংরেজ কোম্পানির সাম্রাজ্য সীমা আফগানিস্তান পর্যন্ত প্রসারিত হয়।

২. শিখ নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব

ঠিক নেতাদের মধ্যেকার পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্ব শিখ সাম্রাজ্যের পতন কে ত্বরান্বিত করে। সরদার তেজ সিংহ ও সরদার লাল সিং এর বিশ্বাসঘাতকতা এবং শিখ নেতাদের আত্মকল হল শিখ শক্তির পতন ঘটায়।

৩. আর্থিক দুর্বলতা

রনজিত সিং এর আমল থেকে সিক রাজ্যের আয় বৃদ্ধির কোন প্রচেষ্টা ছিল না। সেনাদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গীর দান শুরু হলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।

৪. আদর্শ বিচ্যুতি

রনজিৎ সিং এবং তার পরবর্তী সময়েও সর্বশিকবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি অখণ্ড শিখ সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে।

৫. খলসা বাহিনীর দায়িত্ব

লাহোরের দরবারের সিল্ক সর্দারগণ কূটনৈতিক গ্রস্ত হয়ে পড়ায় খরসা বাহিনী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপিক শক্তির পতনকে সম্পূর্ণ করে।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment