ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সমর্থ্য লর্ড ব্যাবিংটন মেকেলের দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা করো

মেকলের দৃষ্টিভঙ্গি

লর্ড টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ১৮০০ ও ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ছিলেন একজন খাদ্যনামা ব্রিটিশ পণ্ডিত, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক এবং হউইগ দলের রাজনৈতিক নেতা। তিনি প্রাচীন রোম ও ইংল্যান্ডের ইতিহাস বিষয় গ্রন্থ রচনা করলেও ভারতের ইতিহাস বিষয়ক কোন গ্রন্থ রচনা করেন নি।। তবে ভারতে ব্রিটিশ শাসক লর্ড ক্লাইভ এবং ওয়ারেন্ট হোস্টিংস এর বিষয়ে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। ‘Lays of Ancient Rome’ এবং ‘the history of England from the association of James II’ তার লেখা উল্লেখযোগ্য দুটি ইতিহাস গ্রন্থ। আইন কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে মেকলে আইন কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে মেকলে ভারতের তার অবস্থানকালের শেষ বর্ষে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে তার ফৌজদারি আইনবিধি রচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার বিভিন্ন আলোচনা ও ক্ষুদ্র প্রবন্ধ গুলিতে ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নিজে আলোচনা করা হলো-

১. ব্রিটিশ জাতির শ্রেষ্ঠ

ঐতিহাসিক মেকলে বিশ্ব সভ্যতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন, যথা- সভ্য জাতিসমূহ এবং অসভ্য জাতি সমূহ। যিনি ব্রিটিশ জাতিকে চূড়ান্ত সভ্য জাতি এবং ভারতীয় সভ্যতা কে চূড়ান্ত নিকৃষ্ট সভ্যতা বলে মনে করতেন। তার মতে উন্নত ব্রিটিশ সভ্যতা ও সংস্কৃতি সংস্পর্শে এসে নিকৃষ্ট ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি ঘটতে পারে। নিকৃষ্ট ভারতীয় সভ্যতাকে উন্নত করার এদেশের ব্রিটিশ শাসনের এক মহান কর্তব্য বলে তিনি মনে করতেন।

২. ভারতের মেকলে

লর্ড মেকলে ভারতের বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের ১৮২৮ ও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে আইন সজিব এবং কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন এর সভাপতি নিযুক্ত হন। তিনি ভারতের চার বছর ১৮৩৪-৩৮ খ্রিস্টাব্দে কাটান। এই সময় তিনি ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজি ভাষা ও রাষ্ট্রপতি ভাবধারায় প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। এই সবাই ভারতীয় সিরাজ চরিত শিক্ষা ও সভ্যতা সম্পর্কে তার অবজ্ঞতা বারংবার প্রকাশিত হয়।

৩. ভারতীয় শিক্ষার নিন্দা

ভারতের ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বে শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছিল সংস্কৃতি বা আরবি ভাষা। মেকলে ভারতীয় সভ্যতা ও চিরাচরিত শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র নিন্দা করে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ২ ফেব্রুয়ারি বেন্টিংকের এর কাছে এক প্রস্তাব বা মিটিং পেশ করেন। এই প্রস্তাবে তিনি উল্লেখ করেন যে,

(১) প্রাচ্যর সভ্যতা হলো দুর্নীতি, অপবিত্র নিবুর্দ্ধিতাপূর্ণ।

(২) প্রাচ্যের শিক্ষার কোন বৈজ্ঞানিক চেতনা নেই। এই শিক্ষা-প্রশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ নিকৃষ্ট।

(৩) মেকলে আরো জানান একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থগারের একটি তাপ ভারত বা আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ।

৪. ইংরেজি ভাষার প্রসার

ভারতের প্রাশ্চাত্য রীতিতে শিক্ষাদানের উগ্র পক্ষপাতি মেকেলের লক্ষ্য ছিল ভারতের সংস্কৃতি বিজয়। তিনি তৎকালীন বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, বিদ্যালয় মাতৃভাষা শিক্ষা গ্রহণের ষষ্ঠ বর্ষ থেকে ইংরেজি ভাষাকে ভারতের উচ্চ শিক্ষার প্রসারে ভাষা মাধ্যম হিসেবে চালু করা উচিত। এর ফলে এদেশের এমন ভারতীয় জনগোষ্ঠী তৈরি হবেন যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয় কিন্তু রুচি, মত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার হবে ইংরেজ।

৫. ক্রমনিম্ন পরিশ্রুত নীতি

মেকলে মনে করেন যে, প্রথম পর্যায়ে ভারতে উৎস ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটতে হবে। জল যেভাবে উপর থেকে নিচের দিকে প্রভাবিত হয় তেমনি পরবর্তীকালে এই উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সহায়তায় পাশ্চাত্য শিক্ষাক্রমে ভারতের সাধারণ ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। মেকেলে এই নীতি ক্রম নিম্ন পরিশ্রুত নীতি বা চুইয়ে পড়া নীতি নামে পরিচিত। এভাবে সকলের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে ভারতের নবজাগরণ ঘটবে।

সমালোচনা

ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে মেকলের বিশেষ ভূমিকা থাকলেও নানা দিক থেকে তার দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচনা করা হয়। লট নেকেলের ইতিহাস চেতনা বিভিন্ন কারণে সমালোচিত হয়েছে, যেমন- ১. মেকলে তার রচনায় প্রতিপক্ষকে অনেক সময় অযৌক্তিকভাবে এবং নির্মমভাবে আক্রমণ করেছেন। ২. মেকলে ইতিহাস রচনার তথ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত মতামত কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। লর্ড অ্যাক্টন বলেছেন যে, “ইতিহাসকে দাঁড়াতে হবে তথ্যের উপরে, ব্যক্তির মতামতের উপরে নয়” ৩. মেকলে প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলী সর্বদা নির্ভরযোগ্য নয়। ৪. হুইগ দলের একনিষ্ঠ সমর্থক মেকলের রচনায় সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কক্ষপথিত ছিল। তার বক্তব্য বহু ক্ষেত্রে একপেশে এবং পক্ষপাত দুষ্ট। ৫. ধ্রুপদি যুগ সম্পর্কে তার যতটা জ্ঞান ছিল ততটা জ্ঞানের মধ্যযুগের ইতিহাস সম্পর্কে ছিল না। ৬. ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিক ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে মেকলের জ্ঞান ছিল সীমিত। ডক্টর অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন যে, সমসাময়িক কালের উচ্ছ্বাসিত অভিনন্দন লাভ করলেও মেকলির ঐতিহাসিক খ্যাতি আজ নিষ্প্রভ। এক শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়নি মিথিলের স্তুতির সপ্তম স্বর্গ হতে নিন্দার পঙ্কশয্যায় নেমে এসেছে।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment