স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভূমিকার মূল্যায়ন
ভূমিকা
আজাদ হিন্দ বাহিনী ব্রিটিশ শাসন থেকে সরাসরি ভারতকে মুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু এতে তাদের গৌরব জনক ভূমিকা বিন্দুমাত্র স্লান হয়ে যায় না। কেননা আজাদ হিন্দ ফৌজের বিয়ে সেনাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী মানসিকতার দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে ব্রিটিশ নৌ বাহিনীর ভারতীয় সেনার বিদ্রোহ ঘোষণা করে যা ভারতের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বতি করে। জন কোনেলের মতে -“আজাদ হিন্দ ফৌজ এর ঘটনা সারা ভারতে কেবল আবেগকে উদ্বেলিত করেননি, সেনাবাহিনীর প্রধান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।”
আজাদ হিন্দ বাহিনী যে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়েছিল তার গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
১. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনে
ধর্ম ও জাতিভেদ ভুলে মাতৃভূমি মুক্তিযজ্ঞে সমস্ত সম্প্রদায়ের আজাদ হিন্দ সেনা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়েছি। তাদের এই লড়াইয়ে আব্বা মোর ভারতবাসীর অন্তরে একতা ও সাম্প্রতিক অনুভব করে দেয়।
২. নৌবাহিনীতে প্রভাব
আজাদ হিন্দ সেনাদের চরম আত্মত্যাগ ও বীরত্বপূর্ণ লড়াই ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে প্রভাব ফেলে। আজাদ লড়াইয়ে ভারতীয় নৌ সেনাদের অন্তরে বিদ্রোহী মনোভাব জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে কিছুকাল পরে ভারতে নৌ বিদ্রোহ ঘটে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রবল অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। নৌ বিদ্রোহের পরেই ভীতি হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নেতা অধ্যাপক রিচার্ডস প্রধানমন্ত্রী এটলিকে বলেন -“তোমাদের এই ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত বর্ষ ত্যাগ করে চলে আশাই উচিত।”
৩. স্বাধীনতা সমস্যা আন্তর্জাতিক স্তরে উত্থাপন
ভারতের স্বাধীনতা প্রশ্ন আজাদ হিন্দ বাহিনীর জন্যই আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের স্বাধীনতাকে অবদমিত করে রেখে ব্রিটিশ সরকার যে অন্যায় করে আসছিল তা সত্য বিশ্ববাসীকে অনুভব করানোর কর্তৃত্ব আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রাপ্য। ঐতিহাসিক তারা চাঁদ বলেছেন – “সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ রাজত্বকালে ভারতবর্ষে সমস্যা গুলিকে জাতীয় স্তর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমস্যার উন্নতি করেছিলেন।
৪. বিদেশের মাটিতে বৃহত্তর সংগ্রামে
আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রামী ছিল বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সবথেকে বড় মুক্তি সংগ্রাম। আজাদ হিন্দ সেনাদের এই লড়াই ভারতবাসীকে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল।
৫. ভারতবাসীর দেশাত্মবোধের উজ্জীবন
যুদ্ধবন্দী আজাদ হিন্দ সেনাদের বিচারের জন্য দিল্লির লালকেল্লা নিয়ে যাওয়ায় হয়। বিচার চলাকালীন তাদের বীরত্বপূর্ণ আত্মহত্যাগ ও সংগ্রামের কাহিনী যত প্রকাশিত হতে থাকে ততই আপার মোর ভারতবাসী দেশাত্মবোধের উদ্বুদ্ধ ও জীবিত হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিকে পেন্ডারেল মুন আগ্নেয়গিরির কিনারার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্রিটিশ লেখক ফিলিপ মেনশন এর মতে এই ঐতিহাসিক বিচারে ব্রিটিশ শাসনের মৃত্যু ঘন্টা ধমনী করে।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতার কারণ সমূহ
ভূমিকা
সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান আপাদ দৃষ্টিতে ব্যর্থ হলে প্রকৃত অর্থে তাদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি। রেঙ্গুনের রণাঙ্গনে যখন আজাদ হীন সেনাদের পিছু সত্তে তখনই আশাবাদী নেতাজি বলেন, ‘আমরা অন্ধকারতম মুহূর্ত অতিক্রম করেছি, সূর্যোদয়ের দেরি নেই। ভারত স্বাধীন হবে।” প্রকৃত অর্থে ভারতের ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেরি হয়নি। ভারতে অচিরে স্বাধীনতা হয়েছিল।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান আপাত ব্যর্থতার কারণ গুলি হল –
১. পরনির্ভরশীলতা
আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতার জন্য অনেককে সুভাষচন্দ্রকে অনেকাংশে দায়ী করেছেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ জানুয়ারির পর্যন্ত তিনি জার্মানির সাহায্য লাভের জন্য বার্লিনে অবস্থান করেন। কিন্তু সেই সাহায্যে লাভে ব্যর্থ হলে আজাদ হিন্দ সেনাবাহিনী খাদ্য, অস্ত্রশস্ত্র এমন কি রণকৌশলের জন্য জাপানের উপর নির্ভরশীল হতে শুরু করে। এই পরনির্ভরশীলতায় আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
২. ভারত থেকে সহযোগিতার অভাব
আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সঙ্গে ভারতের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যোগসূত্র গড়ে তোলার কোন প্রচেষ্টায় গ্রহণ করেনি। এ সময়ের প্রয়োজন ছিল দেশের মধ্যে থেকে একটা গণ অভ্যণ্থান ঘটানো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার না ঘটায় একা আশা হিংসিনারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
৩. ভ্রান্ত সময় নির্বাচন
বার্মা সীমান্ত ধরে যে সময়ে ভারতীয় অভিযান পরিকল্পনা রচিত হয়েছিল, তারা কিছুদিন পরই বর্ষা নেমে যাওয়ায় দুর্গম পার্বত্য সংকল্প পথ ধরে এগিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহ, সবকিছুতেই তীব্র সংকট দেখা দেয়। তাছাড়া মিত্রপক্ষ যখন সুবিধা জনক অবস্থান তখন আজাদ হীন সেনাদের অভিযান শুরু করা ঠিক হয়নি।
৪. অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ভ্রান্ত রণনীতি
জাপানি সেনাপতি মুতাগোচিদের সঙ্গে অন্যান্য সেনা নায়কের বিরোধিতার ফলে সেনাবাহিনী কোহিমা পর্যন্ত এগিয়েও ডিমাপুর আক্রমণ করেনি। ডিমাপুর ছিল ব্রিটিশের ভান্ডার। তাই তা অধিকার করে নিতে পারলে ইম্ফল জয় অনেক সহজ হত। মার্কিন গবেষক ডক্টর জয়েস লেব্রা এ প্রসঙ্গে লিখেছেন বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সেনা সমাবেশ না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত হয়ে লড়াই করার প্রয়োজন ছিল। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ভ্রান্ত রণনীতিতে আজাদ হিন্দ সেনাদের ব্যর্থতার জন্য অনেকটাই দায়ী ছিল।
৫. জাপানের অসহযোগিতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অধ্যায় বার্মা সীমান্তে ইম্ফল অধিকার করার সময় আজাদ হিংসা নদীর যেভাবে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মরিয়া ছিল জাপানিরা, সেইভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। উল্টে জাপান এখানকার সৈন্যদের তুলে নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরী অঞ্চলে বিশ্বযুদ্ধের রণঙ্গনে পাঠিয়ে দেয়। সেনা নায়ক শাহানওয়াজ খান তার গন্ধে লিখেছেন -“জাপানিরা প্রয়োজনীয় রসদ ও সাহায্য না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে ব্যর্থতা থেকে ঠেলে দিয়েছিল।
উপসংহার
বিশ্ববাসীকে ভারতের স্বাধীনতার আশঙ্কায় প্রভাবিত করার সমস্ত কর্তৃত্ব নেতাজি ও তার আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাপ্য। গান্ধীজী বলেছেন -“আজাদ হিন্দ ফৌজ আমাদের সম্মোহিত করেছেন। নেতাজির নাম জাদু মুগ্ধ করে। তা দেশপ্রেম অদ্বিতীয়। তার সমস্ত কাজের মধ্যে সাহসিকতা দীপ্তিমান। তার লক্ষ্য ছিল উচ্চ, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কে ব্যর্থ হয়নি।”