ভারতের শিল্পায়নে সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করো? ভারতের শিল্প শ্রমিকদের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে কি জানো?

ভারতের শিল্পায়নের সামাজিক প্রভাব

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার ভারতকে তাদের শোষণের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। বিদেশি পুঁজিপতিরা ভারতে পুঁজি বিনিয়োগ করে এদের শিল্পে যথেষ্ট প্রসার ঘটায়। তবে এই পুঁজি ঘটিয়ে যে মুনাফা তারা অর্জন করত তা বিদেশে চলে যেত এবং ভারতের পরিবর্তে বিদেশের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটাতো। অর্থাৎ ভারতের বৃটিশদের শোষণের অন্যতম গ্রন্থা ছিল এ দেশে বিদেশীর পুঁজির বিনিয়োগ। তবে বিদেশে পৌঁছে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিল্পায়নের দেশীয় তবে বিদেশে পৌঁছে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিল্পায়নের দেশীয় পুঁজির বিনিয়োগ ও শুরু হয়। ইউরোপীয় ও দেশীয় উদ্যোগে ভারতের আধুনিক শিল্পের বিকাশ ঘটে। ভারতীয় সমাজে শিল্পায়নে বিভিন্ন প্রভাব পড়েছিল, যেমন –

১. অর্থনৈতিক পরিবর্তন

শিল্পায়নের প্রভাবে ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের পারসি, গুজরাটি, মাড়োয়ারি প্রভৃতি বনিক সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে ভারতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটে। ফলে ভারতের কৃষিভিত্তিক স্থবির অর্থনীতি গতিশীল প্রাণচঞ্চল হয়ে পড়ে। ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সুসংবদ্ধ রূপ ধারণ করে।

২. নগরায়ন

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেগুলিকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন নগরের প্রতিষ্ঠা হয়। এই নগর গুলি কালক্রমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতি আন্দোলনের প্রাণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

৩. গ্রাম-জীবনের অবক্ষয়

শিল্পায়নের ফলে ভারতে বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন শহর প্রতিষ্ঠা হয় এবং এইসব শহর আধুনিক কল কারখানায় স্থাপিত হয়। গ্রামের বহু দরিদ্র কৃষক কলকারখানা শ্রমিকের কাজ করি নগদ মজুরি পাওয়ার আশায় গ্রাম ছেড়ে সপরিবারে শহরে চলে আসেতে শুরু করে। ফলে ভারতের গ্রাম জীবনের ভাঙ্গন শুরু হয়।

৪. সর্বভারতীয় চেতনা

ভারতের বিভিন্ন শিলাঞ্চল ও শিল্প নাগরিগুলিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের আগমন ঘটে। এসব কেন্দ্রে তাদের মধ্যে কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান সম্ভব হয়। এভাবে তাদের মধ্যে এক ধরনের সর্বভারতীয় চেতনা গড়ে ওঠে যা ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তা বোধের সঞ্চারণ ঘটায়।

৫. মালিক ও শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব

শিল্পায়নের ফলে ভারতীয় সমাজের শ্রেণীর কাঠামো পাল্টে যায় এবং জন্ম হয় দুটি নতুন শ্রেণী-পুঁজিপতি মালিক শ্রেণী ও দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণী। ভারতীয় পুঁজিপ্রতিদের সংখ্যা খুব কম হলেও তারা ভারতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৬. কৃষকদের দুর্দশা বৃদ্ধি

ভারতের শিল্পায়নের প্রসারের ফলে কৃষকের ওপরে শিল্পের প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্য বা কাঁচামাল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য চাপ বাড়তে থাকে। ফলে বহু ক্ষেত্রে দরিদ্র কৃষক নিজেই পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন না করে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করতে বাধ্য হয়। ফলে কৃষকের ঘরে খাদ্য ভাব দেখা যায়।

ভারতের শিল্প শ্রমিকদের উদ্ভব ও বিকাশ

ভারতের শিল্পায়নের সূচনা ও প্রসার ঘটলে শিল্প কারখানায় শ্রম শ্রাদ্ধ কাজগুলি করার জন্য এদেশে বহু মানুষ শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে উনবির শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এদেশে শিল্প শ্রমিকদের উদ্ভব ঘটে। এই শোমিকরা বাংলা পাট শিল্প, আসাম ও উত্তরবঙ্গের চা বাগিচা, বিহারও বাংলার কয়লা খনি, দক্ষিণ ভারতের কফি বাগিচা, পশ্চিম ভারতে বস্ত্র কারখানা প্রভৃতি নিযুক্ত হতো এই শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

১. শ্রমিকদের ঠিকানা

বাংলা শিল্প শ্রমিকদের একটি বড় অংশ আসত বিহার, উত্তর প্রদেশ, মাদ্রাজ প্রভৃতি বিহীন রাজ্য গুলি থেকে। অন্যদিকে গুজরাট ও মুম্বাইয়ের শ্রমিকদের অধিকাংশ ছিল সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা।

২. ধীর গতি

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের শিল্পায়নের গতি খুব ধীরে ছিল। তাই ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশের গতীয় ছিল খুব ধীর। একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সেখানে মোট জনসংখ্যা ছিল ৩০ কোটি ৩০ লক্ষ, সেখানে সংঘটিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ লক্ষ্য।

৩. পেশাগত পরিবর্তন

গ্রামের কৃষি ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ নিজেদের চিরাচরিত পেশা ছেড়ে কর্মসংস্থানের আশায় শহরে, কল কারখানায় গুলিতে এসে ভিড় করে। প্রথম দিকে ঠিকাদাররা গ্রাম থেকে শ্রমিকদের শহরে আন্ত। শ্রমিকরা ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কারখানায় কাজে আসতো এবং সেখানে তাদের শ্রম বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করত।

৪. প্রতিবাদ

শ্রমিকদের অবস্থা খুবই করুণ ছিল। শ্রমিকরা পুঁজিবাদী মালিকদের শোষণের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের পথে পা বাড়িয়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের তৎপর হয়ে ওঠে। কাজের সময় হ্রাস করা, মজুরি বৃদ্ধি প্রভৃতি দাবিকে তারা আন্দোলনের সামিল হত।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment