সূচনা : উনিশ শতবার শেষের দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্ভুক্ত হয় ভারতের বৈদেশিক ও সীমান্ত নীতি সমূহ। বিশেষত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে নিরাপত্তার জন্য উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ও নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। ব্রিটিশ এই বৈদেশিক সীমান্ত নদীর সুবাদে ইঙ্গ আফগান ও ইঙ্গ ব্রহ্ম সম্পর্কে সৃষ্টি হয়।
ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসারে ইঙ্গ-আফগান দ্বন্দ্ব
প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ
১. প্রেক্ষাপট
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাগাদ রুশো বিস্তার নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে ভারত উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ নজর দেয়। ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আফগান সীমান্ত সুরক্ষা তৎপর হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দুটি নীতি গ্রহণ করে, যথা- ‘নিরপেক্ষতা’ ও ‘অগ্রগামী’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ নীতি।
২. অগ্রগতি
(১) মিত্রতা নীতি : ভারতের ব্রিটিশ সরকার নিরপেক্ষতা নীতি মেনে আফগানিস্তানের অমির দোস্ত মোহাম্মাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে। উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বমূলক ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার করেন। আফগানিস্তানের ওকে দোস্ত মোহাম্মদ এবং ভারতের পক্ষে জন লরেন্স নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে চলে।
(২) মেয়ো আফগান সম্পর্ক : লরেন্সের পরে ভারতের বড় মেয়েও লরেন্স এর মত আফগানদের প্রতি অতটা বন্ধুত্ব মনোভাব সম্পন্নও ছিল না। তবে তিনি কঠোর আফগান নীতি গ্রহণ করলে আফগানিস্তানের প্রতি হস্তক্ষেপ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মূলত উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেষ্ট হন। আবার রাশিয়ার সঙ্গেও তিনি সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেন। এই লক্ষ্যে তিনি ডগলাস ফরসিথকে সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠান।
(৩) নর্থব্রুক-আফনান সম্পর্ক : বড়লাট মেয়র পরে ভারতে বড়লাট হন নর্থব্রুক। তিনি মধ্য এশিয়ার রুশা সম্প্রসারণে সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেন। তবে তিনি চেয়েছিলেন রাশিয়া, পারস্য আফগানিস্তানের হস্তক্ষেপ করবেন না, যদিও এই মর্মে রাশিয়ার কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায় করতে নর্থবুক কখনোই রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। নতুন ভারত সচিব সদসবেরী আফগানিস্তানের সরাসরি ব্রিটিশ প্রভাব গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তবে নর্থবুক রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক মিত্রতা বজায় রাখার আগ্রহ দেখান, ফলে আফগান নীতি নির্ধারণ নিয়ে ভারত সরকার ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।
(৪) হস্তক্ষেপ নীতি : ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ডিজরেলির নেতৃত্বে রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় আসে। এই দল রাশিয়ার সঙ্গে কোন রকম বোঝাপড়ায় নীতি পরিত্যাগ করেন। এই সঙ্গে আফগানিস্তান সম্পর্কে নিরপেক্ষতা নীতি ছেড়ে হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করে। ডিজরেলীর সমর্থন নিয়ে নতুন ভারত সচিব সলসবেরী আফগানিস্তানের কাবুল হীরার অঞ্চল এক ব্রিটিশ প্রতিনিধি পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার আফগানিস্তানের ওপর হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ শুরু করে। ইংরেজ সেনার কয়েকটা অঞ্চলে দখল নিলে শুরু হয় প্রথম ইঙ্গ আফগান যুদ্ধ।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ
(১) লিটন-আফগান সম্পর্ক : লিটন ভারতের বড়লাট হওয়ার পর আফগানিস্তানের বিস্তার নীতি বা হস্তকের নীতি গ্রহণ করেন। তিনি আফগান আমিরকে ব্রিটিশ প্রতিনিধি উপস্থাপনা নির্দেশ দেন, কিন্তু রাশিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে ভেবে আমির এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এদিকে আমিরের আপত্তি থাকলেও আফগানিস্তানকে সমস্ত রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে রুশো আফগান মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়। এতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রুষ্ট হন। যাইহোক শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সেনার আফগানিস্তানের আক্রমণ চালালে শুরু হয় দ্বিতীয় ইঙ্গ আফগান যুদ্ধ।
(২) রিপন-আফগান সম্পর্ক : রিপন আফগানিস্তানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে নীতি নেন। আফগান সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বিশ্বাসী ছিলেন। রিপন ভারতের বড়লার থাকাকালীন আফগানিস্তানের নিরপেক্ষতা নীতি বজায় ছিল।
(৩) ডাফরিন-আফগান সম্পর্ক : ভারতে বড়লাট হওয়ার আগে ডাফরিন রাশিয়ার ব্রিটিশ দ্রুত হিসাবে কাজ করেছিলেন। তাই তিনি মধ্য এশিয়ায় রুশো নীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। বড়লাট বড়লাট হওয়ার পর তাই তিনি ইঙ্গ আফগান মৈত্রীর পথ প্রস্তুত করার চেষ্টা করেন।
(৪) লেন্সডাউন-আফগান সম্পর্ক : লেন্স ডাউন আফগানিস্তানের ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী সীমারেখা ঠিক করার জন্য মারাটিমার ডুরান্ট কে দায়িত্ব দেন। ডুরান্ড দুই দেশের মধ্যে যে সীমারেখা নির্ধারণ করেন, তা ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিতি হয়।
(৫) কার্জন-আফগান সম্পর্ক : ভারতের বড়লাট হওয়ার পর কার্জন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সংস্কার সুষ্ঠু সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি সীমাবদ্ধী স্থানীয় সেনাদের নিয়ে ব্রিটিশ অফিসারদের অধীনে স্থানীয় বাহিনী গড়ে তোলেন এবং ব্রিটিশ সেনাদের সরিয়ে নেন। তাছাড়াও তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নামে এক নতুন সীমান্ত গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত ইঙ্গোর ঔষুধ চুক্তি সম্পাদিত হলে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন ও রাশিয়ার উভয়ই আফগানিস্তানের সমান সুযোগ সুবিধা লাভ করে।
ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসারে ইঙ্গ ব্রহ্ম দ্বন্দ্ব
১. পেক্ষাপট
উনিশ শতকের শেষার্ধে ভারতে ব্রিটিশ সরকার আফগানিস্তান ছাড়াও ব্রহ্মদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু সীমান্ত নীতি গ্রহণ করে। ডালহৌসির আমলে দ্বিতীয় ইঙ্গ ব্রহ্ম যুদ্ধের পর দক্ষিণবঙ্গ ব্রিটিশ আধিপত্য গড়ে ওঠে। ভারতের পূর্ব সীমান্তে ব্রম্ভ দেশে ফরাসি শক্তি প্রতিরোধে লক্ষ্মী ইঙ্গ ব্রহ্ম সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
২. প্রাথমিক সম্পর্ক
(১) ব্রাহ্মরাজদের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্ক : ব্রাহ্মরাজ মিনডন দুই চুক্তির মাধ্যমে ব্রহ্মদেশ ইংরেজদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা দান করেন। কিন্তু ব্রহ্মদেশে ব্রিটিশ প্রাধান্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে মেনে নিতে পারেননি। এছাড়াও তিনি পেগু প্রদৃষ্টি পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হন। পরবর্তী ব্রহ্মরাজ মিনডন এর পুত্র থিবো ব্রম্ভে বাণিজ্যরত এক ব্রিটিশ বাণিজ্যিক সংস্থা (বোম্বে-বার্মা ট্রেন্ডিং কর্পোরেশন) কে আর্থিক জরিমানা করেন। আসলে থিবো উত্তরবঙ্গে কাঠের ব্যবসা নিয়োজিত ব্রিটিশ বাণিজ্যিক সংস্থার কাছ থেকে ব্যবসার অধিকার কেড়ে নিয়ে ফরাসি প্রতিষ্ঠানকে তা দিতে চান।
(২) তৃতীয় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ : ব্রহ্মার আজকের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে ইঙ্গ ব্রহ্ম সম্পর্কে অবনতি ঘটে। যুদ্ধে জেতার পর ব্রিটিশদের অধীনে উত্তর ও দক্ষিণ রম্ভের মিলিত রূপ হিসেবে ব্রহ্মদেশে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশের পরিণতি হয়। অভিযুক্ত ঘটে স্বাধীন ব্রাহ্মণ দেশের।
৩. পরবর্তী পর্যায়
তৃতীয় কিংগো ব্রাহ্ম যুদ্ধের ফলে দেশের এই প্রথম স্থানীয়ভাবে ব্রিটিশ অধিপত্য গড়ে ওঠে। পাশাপাশি পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা সুরক্ষিত হয়। প্রকৃত অর্থ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চিরতরে লক্ষ্যে ব্রাহ্মদেশের হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করে। ব্রাহ্মদেশ ব্রিটিশ অধীনস্থ হওয়ার পর উত্তর ব্রহ্মে বিশেষত্ব ব্রহ্মচীন সীমান্ত অঞ্চলে, ভামো প্রভৃতি এলাকায় করেন, কাচিনে প্রভৃতি উপজাতি গোষ্ঠী হিংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করে। যাইহোক শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মদেশে ব্রিটিশ প্রভূত্ব স্থাপিত হয়।