ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসারে ইঙ্গ-মারাঠা দ্বন্দ্বের পরিচয় দাও ?

সূচনা : তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মারাঠা দুর্বল হয়ে পড়লেও ধ্বংস হয়ে যায়নি। অচিরেই মারাঠা শক্তি পেশোয়া বালাজি বাজীরাওয়ের পুত্র প্রথম মাধ ব রাওরের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তিনি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু হারানো অঞ্চল পুনরায় মারাঠাদের প্রাধান্য গড়ে তুলে। কিন্তু তার অ পুত্রক অবস্থায় অকাল মৃত্যুর পর কনিষ্ঠ ভ্রাতা নারায়ণরাও মারাঠা অধিপত্তি হয়। এরপরে মারাটা রাজ্যে অন্তর দন্দ শুরু হলে ইংরেজ তাতে হস্তক্ষেপ করে।

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রসারে ইঙ্গ-মারাঠা দ্বন্দ্ব

প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ

১. সুরাটের সন্ধি

১. প্রেক্ষাপট : বালক নারায়ন রাওকে হত্যা করে তার পিতৃব রঘুনাথ রাও পেশোয়া পদ দখল করে একদিকে মৃত্যু নারায়ন রাওরের বিধবা পত্নীতার পুত্রসন্তানের জন্মদিন ১২ জন মারাঠা সরদার (বারো ভাইয়ের সমিতি) সেই শিশু পুত্রটিকেই পেশোয়া পদে মনোনয়নের দাবি তোলে এর ফলে রঘুনাথ রাও রাজ্য চুক্তি হয়।

(২) সন্ধি রক্ষা : রাজ্যচুক্তি রঘুনাথ রাও পেশোয়াপদ পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্য ইংরেজদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ফলে ইংরেজ ও রঘুনাথ রাওয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সুরাটের সন্ধি।

(৩) শর্তাবলী : এই সন্ধির মাধ্যমে স্থির হয়- (i) ইংরেজি সাহায্য নিয়ে রঘুনাথ পেশোয়া থাকবেন। (ii) ইংরেজরা রঘুনাথ রাওকে ২ ১/২ হাজার সেনা দিয়ে নিরাপত্তা দেবেন যাদের খরচ চালানোর জন্য তিনি কোম্পানিকে মাসে ১ ১/২ লক্ষ্য টাকা দেবে। (iii) কোম্পানির মুম্বাই কর্তৃপক্ষকে তিনি গুজরাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, সলসেট ও বেসিন ছেড়ে দেবেন।

(৪) ফলাফল : রঘুনাথ রাও ও ইংরেজদের মিলিত বাহিনী আরাসের যুদ্ধ পেশোয়ার সেনাবাহিনী কে পরাজিত করে। রঘুনাথ রাও পুনরায় পেশোয়া হন। সূচনা ঘটে প্রথম ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধে।

২. পুরন্দরের সন্ধি

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রেগুলেটিং অ্যআক্ট পাস করিয়ে বলা হয় মুম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলিং সমস্ত সিদ্ধান্ত কলকাতা কাউন্সিলের অনুমোদিত হতে হবে। কলকাতা কাউন্সিলিং সুরাট চুক্তিতে অনুমোদন হিল বলে উল্লেখ করে। গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হোস্টিং সুরাটের সন্ধি বাতিল করে দিয়ে পেশোয়ার সঙ্গে ‌পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষর ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে করেন।

৩. ওয়ারগাঁও এর সন্ধি

মুম্বাই কর্তৃপক্ষ পুরন্দরের সন্দীপ মানেনি তারা ইংল্যান্ডের কোম্পানির সভাকে জানিয়ে সুরাটে সন্ধি মেনি রঘুনাথ রাও এর পক্ষ নেন। মারাঠা পশু আর পক্ষে নানা ফড়নবিশ লড়াই শুরু করে তা ফড়নবিশ কূটনীতির কাছে রঘুনাথরাও ও ইংরেজদের মিলিত জোট হার মানে এবং ওয়ারগাঁওয়ের সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হয় ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে।

৪. সলবাই-এর সন্ধি

(১) পেক্ষাপট : ওয়ারেন হোস্টিং সন্ধি অস্বীকার করে এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ ইংরেজদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত মারাটা নায়ক মাহাদজি সিন্ধিয়ার মধ্যস্থতায় সলবাই এর সন্ধি ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয়।

(২) সন্ধির শর্ত : (i) ইংরেজরা সলসেট ও ব্রোচ লাভ করে। বেসিন মারাঠাদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। (ii) দ্বিতীয় মাধব রাও পেশোয়া হিসেবে স্বীকৃতি পান। রঘুনাথ রাওকে বার্ষিক বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করা হয়। (iii) সিন্ধিয়া যমুনা নদীর পশ্চিম উপকূল অধিনস্থ সমগ্র ভূখণ্ড ফিরে পান। উভয়পক্ষ জাতীয় সন্ধির শর্তাবলী মান্য করে তা দেখার দায়িত্ব পান মহাদজী সইন্ধইয়আ।

(৩) সলবাই- এর সন্ধির গুরুত্ব : হোস্টিংস এর মারাঠা নীতি ফল প্রশু হয়নি। শুধুমাত্র সলসেট ও ব্রোচ ছাড়া ইংরেজদের কিছু লাভ হয়নি। বরং যথেষ্ট আর্থিক ক্ষতি হয়। শংকর দূর করার জন্য হোস্টিংকে বহু অবৈধ উপায় গ্রহণ করতে হয়। সলবাইয়ের সন্ধির ফলে পরবর্তী কুড়ি বছর ইংরেজ ও মারাঠাদের মধ্যে কোন সংঘর্ষণ হয়নি। এই সুযোগে ইংরেজরা ভারতে অন্যান্য শক্তিকে পরাস্ত করতে পেরেছিল।

৫. বেসিন-এর সন্ধি

(১) পটভূমি : ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের নানা ফড়নবিশ মৃত্যুর পর মহারাষ্ট্রের ভাগ্য এক শ্রেণীর উদ্ধত, ক্ষমতা লোভ, অপরিমান দর্শী যুব নেতার হাতে পড়ার ফলে সেখানে গৃহ বিবাদের সূচনা হয়। যশোবন্ত রাও হল কারও দৌলতরাও সন্ধ্যার মধ্যে বিরোধ বাধলে পেশোয়া দ্বিতীয় সিন্ধিয়ার পক্ষ নেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে হল কার পুনা আক্রমণ করে পেশোয়া ও সিন্ধিয়ার সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও আত্মরক্ষার জন্য ইংরেজ সাহায্য প্রার্থী হন। ফলে উভয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় বেসিনের সন্ধি ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে।

(২) শর্ত : এই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী স্থির হয়- (i) ফ্রেশওয়াকে রক্ষা করার জন্য পুনেতে ৬ ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন থাকবেন, পেশোয়া কোম্পানিকে বেসিন, সুরাটসহ কিছু অঞ্চল ছেড়ে দেবে। (ii) কোম্পানি অনুমতি ছাড়া পেশোয়ার তৃতীয় কোন শক্তির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করতে পারবে না। (iii) নিজাম, গায়কোয়াড এদের সঙ্গে বিরোধ বাধলে পেশোয়া ইংরেজদের মধ্যস্থতা মেনে নেবেন। (iv) কোম্পানি অনুমতি না দিলে সেনাদলের পেশোয়া কোন ইউরোপিকে নিয়োগ করতে পারবেন না।

(৩) গুরুত্ব : এভাবে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নিয়ে মারাঠাদের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেন। বেসিনের সন্ধির দ্বারা ব্রিটিশদের প্রধান দেশীয় প্রতিপক্ষ মারা তাদের উত্থানের সম্ভাবনাকে চিরতরে বিনষ্ট করা হয়। ফলে কোম্পানি সর্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করে।

দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ

সিন্ধিয়া ও ভোসলে বেসিনের চুক্তি মানতে পারেনি। অপরদিকে পেশোয়া বাজিরাও মনেপ্রাণে এই সন্ধ্যে মেনে নেয়নি। তারা একজন হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রস্তুতি নিলে শুরু হয় দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ। যুদ্ধে হেরে গিয়ে সিন্ধিয়া ও ভোসেল ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধি করেন ও অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নেন। দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধের পর মারাঠা শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইংরেজ বিরোধী জোট গঠন

দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধে ব্যর্থতার ফলে মারাঠা রাষ্ট্রসঙ্ঘের হতাশা দেখা দেয়। তবে স্বাধীনচেতা মারাঠাদের পক্ষে বিদেশি ইংরেজদের করতে দীর্ঘদিন সহ্য করা সম্ভব ছিল না, তাই পেশোয়ার নেতৃত্বে তারা আবার ইংরেজবিরোধী জোট গঠন করে।

তৃতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ

১. পাঠভূমি

গর্ভনর জেনারেল লর্ড হোস্টিংয়ের লর্ড ময়রা উপলব্ধি করেন যে, মারাঠাদের ব্রিটিশদের অধীনে আনতে না পারলে ভারতের ব্রিটিশের সর্বভৌমত্ব স্থাপন করা যাবে না। তাই তিনি আরও কঠোর শর্ত ে পেশওয়াকে পুনরায় সন্ধি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। মারাঠা রাষ্ট্র মন্ডলের বিলুপ্তি, পেশোয়া পদের অবলুপ্তি, সিন্ধিয়া, হোলকার, ভোসলে স্বাধীনতাকে হার্ট করে তাদের ওপরে কঠোর শর্ত সন্ধি আরোপ করার কাঠামো নেতাদের আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবাদ আহত হয়। তাই আত্মকলহে দীর্ণ মারাঠা শেষবারের মতো পেশোয়ার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়।

২. যুদ্ধের সূচনা ও সমাপ্তি

পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও অকস্মাৎ কিকির বিটিশ দূতাবাস আক্রমণ করলে তৃতীয় ইঙ্গ মারাটা ১৮১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়। এই যুদ্ধের পেশোয়ার সঙ্গে যোগ দেন হোলকার, সিন্ধিয়া, ভোসলে ও নাগপুরের আপ্পা সাহেব। কিন্তু এই যুগে পেশোয়ার দ্বিতীয় বাজিরাও পরাস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

৩. ফলাফল

এই যুদ্ধের ফলাফল গুলি নিম্নরূপ-

(১) ইংরেজরা পেশোয়ার রাজ্য পুরোপুরি দখল করে নেয় এবং পেশোয়ার পথ বিলোপ করা হয়।

(২) দ্বিতীয় বাজিরাও কে কানপুর এর কাছে বিঠুর বাসিন করার পাশাপাশি তাকে বাৎসরিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়।

(৩) সাতারার সিংহাসনে শিবাজী জৈন বংশধর ইংরেজদের ইচ্ছায় নামে মাত্র অধিষ্ঠিত হয়।

(৪) ইংরেজরা সমগ্র মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রকৃত অধীশ্বর হওয়ার অস্তমিত হয় স্বাধীন মারাঠা সাম্রাজ্য করার সম্ভাবনা।

মারাঠা পতনের কারণ

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে এরপর যেভাবে মারাঠা শক্তির উত্থান ঘটেছিল তা ইংরেজদের আক্রমণ ভেঙে পড়া সত্যিই বিস্ময়কর। ঐতিহাসিক গ্রান্ড ডাফ বলেছেন -“মারাঠাদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের দ্রুত জয় এবং মনাঠাদের দ্রুতপতন ছিল বিস্ময়কর।

১.

অন্তর্দন্দ্ব মধ্য ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে মারাটা আধিপত্যের বিস্তার করলে মারাঠা রাজ্য অন্তর্দন্দ্ব গজায় ছিল। ইন্দ্ররের হোলকার, নাগপুরের ভোসেল, গোয়ালিয়রে সিন্ধিয়া, বরদায় গাইকোয়ার এবং ক্ষার অঞ্চলে পাওয়ার প্রভৃতি বংশ নিজেদের কর্তৃত্ব গড়ে তোলে, হল কারে রাজ্যে মালাহার রাও হোলকারএবং কাশিরা রাও হোলকারের দ্বন্দ্ব, ভোসলের রাজ্য ও আপ্পাসাহেবের দ্বন্দ্ব, গাইকোয়ারের রাজ্য আনন্দরাই গাইকোয়ার ও কানহোজি গাইকোয়ারের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব মারাঠা ঐক্য ফাটল ধরায়।

২. দক্ষ নেতৃত্বের অভাব

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পর একসঙ্গে বেশ কিছু যোগ্য নেতা, যথা -তুকোজি হোলকার, নানা ফড়নবিশ, মহাদজি সিন্ধিয়া, প্রথম মাধব রাও প্রমুখ যোগ্য ও দক্ষ নেত্রবৃন্দের আবির্ভাব ঘটেছিল কিন্তু এদের মৃত্যুর পর যে সমস্ত মারাটা নেতৃবৃন্দের উদ্ভব ঘটে তাদের অপদার্থতা, অকর্মতা এবং জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে উদাসীনতা মারা থাকে পতনকে নিশ্চিত করে।

৩. সমর দুর্বল

হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, তেলেগু ও আরবদের নিয়ে গঠিত হওয়ায় মারাঠা সেনাদলে যথেষ্ট ঐক্য বা সংহতি অভাব ছিল। এছাড়াও একজন আরব বা পর্তুগিজ বা খ্রিস্টান সেনার তুলনায় মারাটা সেনার বেতন কম থাকায় তারা এই যুদ্ধে আগ্রহী ছিল না। ফলে মারাটা পথ নিশ্চিত হয়

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment