ভারতীয় অর্থনীতিতে রেলপথ স্থাপনের সদর্থক প্রভাব গুলি সম্পর্কে আলোচনা করো? অথবা, ভারতীয় অর্থনীতিদের রেলপথ স্থাপনের সুফল গুলি উল্লেখ করো?

রেলপথ স্থাপনের সদর্থক প্রভাব বা সুফল

ব্রিটিশ শাসনকালে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের সু বিস্তৃত অঞ্চলের রেলপথ প্রসারন ঘটে। ডঃ বিপান চন্দ্র বলেছেন যে, “ভারতের রেলপথের প্রবর্তন ভারতীয় জনজীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।” ভারতের উপনিবেশিক অর্থনীতিতে রেলপথ স্থাপনের সদর্থক ও নঞর্থক উভয় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই সদর্থক প্রভাব বা সুফল গুলি সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হলো-

১. যোগাযোগের প্রসার

ভারতে রেলপাতের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক অগ্রগতি ঘটে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে প্রশাসনিক বৈঠ গড়ে ওঠে এবং সরকারি কাজে গতি বৃদ্ধি পায়।

২. পরিবহনের উন্নতি

আগে ভারতের পশু চালিত শকট, নৌকা প্রভৃতি ছিল দেশের প্রধান পরিবহন মাধ্যম। এই ব্যবস্থা ছিল ব্যয়বহুল, বিপদজনক ও সময় সাপেক্ষ। রেলপথ স্থাপনের আগে ভারতের পরিবহন ব্যবস্থা খুবই অনুন্নত পণ্য ছিল। রেলপথ স্থাপনের পর এর মাধ্যমে ভারতের মানুষ ও পণ্য পরিবহনে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে। অতি দ্রুত মানুষ ও পণ্য চলাচল সম্ভব হওয়ায় দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় দূর দূরান্তরের খাদ্য পাঠানো সহজ হয়।

৩. আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি

আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য মূল্যে যথেষ্ট পার্থক্য হতো। রেলপথের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হলে তাদের মধ্যে পণ্য চলাচল সম্ভব হয়। ফলে পণ্য মূল্যের আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস প্রায় এক আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

৪. রপ্তানি বৃদ্ধি

রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের ব্যয় খুব কম হতো। ফলে ভারতের বিভিন্ন কৃষি পণ্য রেলের মাধ্যমে সহজে বন্দরে নিয়ে যাওয়া যেত। বন্দর গুলি থেকে ভারতের পণ্য সামগ্রিক সহজে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। ১৮৬২ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত থেকে রপ্তানি বাণিজ্য প্রায় ২ ১/২ গুণ বৃদ্ধি পায়।

৫. আমদানি বৃদ্ধি

রেলের মাধ্যমে ভারতের বিদেশি পণ্যের আমদানি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বিলাতের বিভিন্ন শিল্প পণ্য ও বিলা সামগ্রী ভারতের বন্দরে এসে তার রেলের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে আমদানির পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি পায়।

৬. আন্তর্জাতিক বাজার

আগে আঞ্চলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভারত কৃষি উৎপাদন চালাতো। রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতের কৃষি পণ্য রেলের মাধ্যমে বন্দরে পৌঁছে সহজে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগ পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি মূল্য পাওয়া যায় এমন কৃষি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

৭. শিল্পায়ন

কার্ল মার্কস বলেছেন যে, রেল ব্যবস্থায় ভারতের আধুনিক শিল্পায়নের প্রকৃত অগ্রদূত হবে। বাস্তব ক্ষেত্রেও রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতীয় শিল্পের বিকাশ পটভূমি তৈরি হয়। রেল ব্যবস্থার স্বল্প ব্যগে কাঁচামালের যোগান দিয়ে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছে দিয়ে লোহা, ইস্পাত ও কয়লা প্রভৃতি আধুনিক শিল্পের বিকাশে সাহায্য করে।

৮. কর্মসংস্থান

ভারতের রেলপথের স্থাপনের ফলে রেলপথ নির্মাণ, রেল কারখানার প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। দেশের ভূমিহীন কৃষকরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে রেলের কাজে নিযুক্ত হয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় রেলের নিযুক্ত মোট কর্মী সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৩ হাজার।

৯. জাতীয় ঐক্য

রেলপথের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। ফলে ভাষা, ধর্ম ও গোষ্ঠীগত বিভেদের প্রাচীর ভেঙে যায় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও মতামত আদান-প্রদান বৃদ্ধি পায়। এভাবে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার

ভারতের রেলপথের প্রসারে বিভিন্ন সদর্থক প্রভাব বা সুফল থাকলেও ব্রিটিশ সরকার নিজেদের সাধ্য সিদ্ধির জন্যই এ দেশে রেলপথ স্থাপন করেছিল তাদের সন্দেহ নেই। তবে সার্বিক বিচারে রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতীয়রা উপকৃতই হয়। রেলপথ প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কুপ্রভাব ও লক্ষ্য করা যায়। রেল যোগাযোগের ফলে ভারতের ব্রিটিশদের আর্থিক শোষণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। মার্কিন ঐতিহাসিক বুকানন বলেছেন যে, “স্বনির্ভরতার যে বর্ম ভারতের গ্রামগুলিকে এতদিন রক্ষা করে এসেছিল, ইস্পাতের রেল সেই বর্মভেদ করে গ্রাম জীবনের রক্ত শোষণ শুরু করে দেয়।”

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment