ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় বাগিচা শিল্পের অগ্রগতির পরিচয় দাও ?

ভারতে বাগিচা শিল্পের অগ্রগতি

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের শিল্প স্থাপন ইউরোপীয় পুঁজি প্রতিরা বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করে। তাদের উদ্যোগে এদেশে যেসব শিল্পের বিকাশ ঘটে সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল বাগিচা শিল্পের বিকাশ। তাদের উদ্যোগে বিকশিত বাগিচা শিল্প গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল চা, কফি, নীল ও আখ প্রভৃতি শিল্প। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতের বাগিচা শিল্পের বিকাশ ও অগ্রগতিতে ইউরোপীয় পুঁজিপ্রতিদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতে বাগিচা শিল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

১. চা

(১) প্রাথমিক উদ্যোগ : রবার্ট ব্রুস নামের জৈন ইংরেজ আসামের জঙ্গলে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে চা গাছ আবিষ্কার করেন। ইংরেজ শাসকদের মধ্যে লর্ড বেন্টিং সর্বপ্রথম চায়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং এ সম্পর্কে কিছু তথ্যাদি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে একটি চা কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির দেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের চা শিল্প গড়ে ওঠে। সরকার চা বাগিচাগুলির বিদেশি মালিকদের করমুক্ত জমি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়। কালক্রমে চা একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি দ্রব্যে পরিণত হয়।

() চা উৎপাদক অঞ্চল : সরকারি সহযোগিতায় আসাম, বাংলার পার্বত্য অঞ্চল, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাবের কাংড়া অঞ্চল, হিমাচলের তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চল, দক্ষিণ ভারতে পার্বত্য অঞ্চল, নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চল প্রভৃতি এলাকায় ধীরে ধীরে চা শিল্পের প্রসার ঘটে। কয়েকজন ইংরেজ শিল্পপতি আরশ ঊ৩৯ খ্রিস্টাব্দে আসামে কি কোম্পানি গড়ে তোলেন।

(৩) ব্যাপক প্রসার : ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভারতের চা শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কুড়িটি চা কোম্পানি রেজিস্ট্রি ভুক্ত হয়। ১৮৬৬-৬৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতে উৎপন্ন মোট চায়ের পরিমাণ ছিল ৬ লক্ষ পাউন্ডেরও বেশি। উনিশ শতকের শেষ দিকে আসাম বেঙ্গল রেলপথের প্রতিষ্ঠা ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি হলে চার শিল্পের অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন ভারত থেকে ১৩ কোটি ৭০ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের চাল ক্রয় করে। যার শিল্পের প্রসারের উদ্দেশ্যে দা ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এদেশে প্রায় ৫ লক্ষ কুড়ি হাজার একর জমি ওপর তিনশো দুটি চা বাগিচা গড়ে ওঠে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭, ০৭, ৭৩৩ একর।

২. কফি

ইউরোপীয় মালিকানায় ফোর্ট গ্লাস্টার সংস্থা ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রথম কফি চাষ শুরু করে। বাংলায় কফির চাষের বিশেষ সুবিধা জনক না হয় দক্ষিণ ভারতে নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চল এবং মহীশূড়ে কফি চাষ শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতের দুটি উল্লেখযোগ্য কফি চাষ কেন্দ্র করেছিল কুর্গ ওয়েইনাদ। দক্ষিণ ভারতের কফি শিল্প যথেষ্ট সাফল্য লাভ করে। কফি শিল্পী ইউরোপীয় উদ্যোগে যেসব কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ডানকান ব্রাদার্স, উইলিয়াম ম্যাগর, অ্যান্ড্রু ইয়উল প্রভৃতি। তবে এই শিল্পে ভারতীয় পুঁজি প্রতিরা বিশেষ সাফল্য পাননি।

৩. নীল

বাংলার ১৭৭ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম নীল কারখানা স্থাপিত হয়। ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রথম স্থান অধিকার করত নীল। এদেশের উৎপাদিত নীলের মধ্যে বাংলা ও বিহারের নীল ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। এই সময় ইংল্যান্ডের বস্ত্র শিল্পের উৎপাদনের বিপ্লব ঘটলে ইংল্যান্ডের বাংলা নীলের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজ নীলকর সাহেবরা বাংলায় নীল চাষীদের ওপরের সীমাহীন অত্যাচার চালাত। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ছাড়িয়ে পড়ে। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে কৃত্রিম নিয়ে লাভ আবিষ্কৃত হলে ভারতের নীল চাষ গতি হারায়।

৪. আখ

ইউরোপীয় পুঁজিপতিরা আগ বা চিনি শিল্পে যথেষ্ট ও মূলধন বিনিয়োগ করেছিল। তাদের উদ্যোগে এদেশের বিহারে মারহাওড়া ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের প্রথম চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে চিনিকলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ টি। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারতে ৩০ টি চিনিকলের প্রায় ১ লক্ষ ৫৮ হাজার টন চিনি উৎপাদিত হয়। পরের বছর চিনি শিল্পের সরকার সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করলেই শিল্পের আরো উন্নতি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের মধ্যে ভারত চিনিকলের সংখ্যা ১৬১ তে পৌঁছায়। অবশ্যই এই সবগুলির ইউরোপীয় পুঁজিপ্রতিদের মালিকানাধীন গড়ে উঠেছিল।

উপসংহার

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকারে অবসান ঘটে। ইউরোপীয় পুঁজিপতিরা এদেশের বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে। তাদের পুঁজি বিনিয়োগের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল বাগিচা শিল্প। এই শিল্পী ইউরোপীয় পুঁজিবাদীদের তুলনায় দেশীয় প্রজাপতিদের উদ্যোগ ছিল খুবই সামান্য।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment