বিভিন্ন ভারত শাসন আইন
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারত শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে থেকে প্রতি কুড়ি বছর অন্তর চার্টার বা সনদ আইন পাস করে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে থাকে। অবশেষে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের সর্বশেষ চার্টার এক কেজে কোন সময় ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটানো ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এরপর থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সদস্যি আন্দোলন পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতের শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে যেসব আইন প্রণয়ন করে সেগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল- ১. ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের শাসন আইন। ২. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের শাসন আইন এবং ৩. ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন। এই আঙ্গুলের নিচে আলোচনা করা হলো।-
১. ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর লর্ড পামারস্টোন ব্রিটিশ ভারতের শাসন ব্যবস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাজ থেকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য একটি বিল পাস করেন। যেটি ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ২ আগস্ট ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত হয়।
(১) শর্তাবলী : ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন অনুসারে-(i) ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে (ii) ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকার অর্থাৎ ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া নিজের হাতে গ্রহণ করেন। (iii) ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া বা ভারত সচিব নামে ভারত বিষয়ক একজন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ইংল্যান্ডের অবস্থান করে পরোক্ষভাবে ভারত শাসন পরিচালনা করেন। (iv) ১৫ সদস্য বিশিষ্ট ইন্ডিয়ান কাউন্সিল গঠন করে ভারত সচিবের কাজে সহায়তা ব্যবস্থা করা হয়।। (v) রানীর প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে গর্ভনর জেনারেল কে প্রত্যক্ষভাবে ভারত শাসনের অধিকার দেয়া হয়। (vi) এখান থেকে গর্ভনর জেনারেলের উপাধি হয় ভাইসরয়। লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় হিসেবে নিযুক্ত হন।
(২) মূল্যায়ন : (i) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনের দ্বারা ভারত সচিবের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। ফলে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পদশালী ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়ে। (ii) এই আইনের শাসন কার্যে ভারতীয়দের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
২. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনের ত্রুটিগুলি দূর করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন পাস করে।
(১) শর্তাবলী : ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন অনুসারে- (i) বড়লাটের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের ছয় থেকে ১২ জন সদস্য রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এর অর্ধেক হবে ইংরেজ ও ভারতীয় সমন্বয়ে বেসরকারি সদস্য। (ii) কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের মত বাংলা, মুম্বাই এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে প্রাদেশিক আইন পরিষদ গঠিত হয়। (iii) বড়লাটের সম্প্রতি প্রাপ্ত কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের কোন আইন ভারত সচিব নাকচ করতে পারতেন।
(২) মূল্যায়ন : (i) ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনের দ্বারা প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভা গড়ে ওঠেনি। (ii) অবশ্য এই আইনের সর্বপ্রথম আইন রচনার কাজে ভারতীয়দের যোগদানের অধিকার দেওয়া হয়।
৩. ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন
১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের আইনের দ্বারা ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। ভারতীয়রা কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক আইনসভার অধিক সংখ্যক নির্বাচিত প্রতিনিধি গ্রহণের দাবী জানাতে থাকে। এর ফলে সরকার ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন পাস করে।
(১) শর্তাবলী : ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনে বলা হয়, (i) বড়লাটের আইন পরিষদে. ১০ থেকে ১৬ জন অতিরিক্ত সদস্য থাকবেন। (ii) আইনের পরিষদের ২/৫ অংশ বেসরকারি সদস্য হবেন। (iii) এই সদস্যদের পাঁচ জন নির্বাচিত এবং বাকিরা বড়লাটের দ্বারা মনোনীত হবে।
(২) মূল্যায়ন :(i) ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনের দ্বারা ভারতীয় প্রকৃতি গণতান্ত্রিক অধিকার পায়নি। (ii) ভারতীয়রা শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে ও প্রকৃত অধিকার পাইনি। (iii) অবশ্যই এই আইনের মাধ্যমে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাসবিহারী ঘোষ, গোপালকৃষ্ণ গোখলে প্রমুখ কেন্দ্রীয় আইনসভার পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
উপসংহার
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত আইন গুলি ছিল একে অপরের পরিপূরক। ভারত শাসন আইন গুলি ভারতীয়দের ন্যায্য গণতান্ত্রিক দাবি পূরণে কখনো আন্তরিক ছিল না। এই আইনগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের সাথে রক্ষা এবং এদেশের ব্রিটিশ শাসন ও সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা, ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করা নয়। এজন্য ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র শাসনব্যবস্থা সঙ্গে ভারতীয়দের যুক্ত করার বিষয়টিকে একটি ধাপ্পাবাজি বলে অবহিত করেছেন।