বৈদিক যুগের বর্ণব্যবস্থার পরিচয় দাও।

সূচনা: বহিরাগত আর্যরা ভারতে বসতি বিস্তারের পরবর্তীকালে এখানকার স্থানীয় অনার্যদের থেকে নিজেদের ব্যবধান স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে বর্ণপ্রথার প্রচলন করে। এই বর্ণপ্রথাই সমাজে জাতিপ্রথার ভিত্তিভূমি রচনা করে।

বৈদিক যুগের বর্ণব্যবস্থার পরিচয়

[1] চতুর্বর্ণের পরিচিতি: সাধারণভাবে বর্ণ’ বলতে বৈদিক সমাজের চতুর্বর্ণকে বােঝানা হয়। বৈদিক সমাজ চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। এগুলি হল— [i] ব্ৰায়গ, [ii] ক্ষত্রিয়, [iii] বৈশ্য ও [iv] শূদ্র। ঋগবেদের পুরুষসূত্তে বলা হয়েছে যে, একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা গড়ে তােলার উদ্দেশ্যে সৃষ্টিকর্তা ব্রয়া নিজের দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে এই চারটি বর্ণের সৃষ্টি করেছিলেন।

[2] চতুর্বর্ণের উৎপত্তি: ঋগবেদের পুরুষসূক্তের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে যে, আদি পুরুষ ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণ, বাছুদ্বয় থেকে ক্ষত্রিয়, উরুদেশ থেকে বৈশ্য ও চরণযুগল থেকে শূদ্রের উৎপত্তি হয়েছে। উৎপত্তি অনুসারে সমাজে সবার ওপরে ব্রাহ্মণদের এবং সবার নীচে শূদ্রের স্থান।

[3] চতুর্বর্ণের কর্ম বিভাজন: বেদে চতুর্বপের জন্য পৃথক পৃথক কাজেরও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুসারে [i] ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল যাগযজ্ঞ, পূজার্চনা ও অধ্যয়ন- অধ্যাপনা করা, [ii] ক্ষত্রিয়দের কাজ ছিল দেশ শাসন ও দেশ রক্ষা করা, [iii] বৈশ্যদের কাজ ছিল ব্যাবসাবাণিজ্য, কৃষিকার্য ও পশুপালন করা এবং [iv] শূদ্রদের কাজ ছিল উপরােক্ত তিনটি শ্রেণির সেবা করা। ভৃত্য, কায়িক শ্রমজীবী ও কৃষকরা ছিল শূদ্র বর্ণের অন্তর্ভুক্ত। ব্রাহ্মপ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা উপবীত ধারণ করতেন এবং এই সংস্কারকে তাদের দ্বিতীয় জন্ম বলে মনে করা হত। এজন্য তাঁরা ‘দ্বিজ’ নামে পরিচিত হতেন।

[4] বর্ণভিত্তিক কিন্তু মুক্ত সমাজ: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ঋবৈদিক যুগের সমাজ বদ্ধসমাজ ছিল না, এক বর্ণ থেকে তখন অন্য বর্ণে যাওয়া যেত। অধ্যাপক বটোমাের বলেছেন যে, “এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণের যাওয়ার সুযােগ সকলেরই ছিল। নিম্নবর্ণের কোনাে ব্যক্তি তার যােগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে উচ্চ বর্ণে উন্নীত হতে পারত।’ সমাজে অসবর্ণ বিবাহও স্বীকৃত ছিল।

[5] পঞ্চম শ্রেণির অস্তিত্ব: বৈদিক চতুর্বর্ণ কাঠামাের বাইরেও অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্য বহু মানুষ বাস করত। তারা মুচি, মেথর ও অন্যান্য নীচু কাজে নিয়ােজিত হত। এই শ্রেণিকে অধ্যাপক শ্যামচরণ দুবে সমাজের পঞ্চম শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

[6] বর্ণ থেকে জাতির উদ্ভব: ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, ঋগবৈদিক যুগে ‘বর্ণ” বলতে কখনােই ‘জাতি- কে বােঝাত না। বর্ণ’ ও ‘জাতি দুটি পৃথক সত্তা। বৈদিক যুগের প্রথমদিকে চতুর্বর্ণকে ভিত্তি করে অল্প কয়েকটি জনগােষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও পরবর্তীকালে নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হলে পুরােনাে বর্ণভিত্তিক জনগােষ্ঠীগুলি থেকেই নতুন নতুন জনগােষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। এই পুরােনাে ও নতুন জনগােষ্ঠী-গুলিই এক- একটি জাতি হিসেবে গণ্য হতে থাকে।

উপসংহার: ঋগবৈদিক যুগের বর্ণপ্রথা থেকে পরবর্তীকালে যে জাতিব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে তা আরও পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন মিশ্রজাতির জন্ম দেয়। ফলে বৈদিক সমাজের চতুর্ব্প্রথার বিশুদ্ধতা পরবর্তী বিভিন্ন যুগে লোপ পায় এবং তা ক্রুমে জাতিগত সমন্বয়ের পথ প্রস্তুত করে।

History সব প্রশ্ন উত্তর (একাদশ শ্রেণীর)

Leave a Comment