দস্তক-এর অপব্যবহার
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য সুরম্যান এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলকে দিল্লির মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ারের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে পাঠায়। তার ফলস্বরূপ দিল্লির মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুকূল এক ফরমান বা ঘোষণা জারি করেন। এই ঘোষণা অনুসারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বার্ষিক ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলার বিনাশুক্লে বাণিজ্য ও অন্যান্য কিছু অধিকার লাভ করে।
এই ঘোষণা ফারুকশিয়ারের ফরমান বা দস্তক নামে পরিচিত। দিল্লি সম্রাট এর কাছ থেকে বাংলার বিনাশুল্কে অধিকার পেয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দস্তকের অধিকার প্রযোজ্য ছিল না। কিন্তু তারা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা এই অধিকার ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে থাকে ফলে নবাবের রাজত্ব আদায় অনেকাংশে কমে যায়। এই ঘটনা দস্তকের অপব্যবহার নামে পরিচিত।
সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজদের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধের কারণ
বাংলা নবাব আলীবর্দী খাঁ-র মৃত্যুর পর তার কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসার পর শীঘ্রই তার সঙ্গে কলকাতার ইংরেজ কর্তৃপক্ষের বিরোধ শুরু হয়। এই বিরহের পরিণতিতে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন উভয় পক্ষের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পলাশীর যুদ্ধের বিভিন্ন কারণ ছিল যেমন –
১. আনুগত্য প্রদর্শনে দেরি
সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাবী সিংহাসনে বসার পর প্রথা অনুযায়ী আনুগত্য জানিয়ে ফরাসি, ওলন্দাজ প্রভৃতি বণিক জাতি গুলি এবং বাংলার জমিদার সিরাজকে উপঢৌকন পাঠিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু ইংরেজরা ইচ্ছাকৃতভাবে উপঢৌকন পাঠাতে দেরি করে। এতে সিরাজ অপমানিত বোধ করেন সন্দেহ করেন যে ইংরেজরা তার বিরোধী চক্রান্তকারীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতে পারে।
২. ষড়যন্ত্র
সিরাজ বাংলার নবাবের সিংহাসনে বসার সময় তার সিংহাসন লাভের বিরোধিতা করে ঘসেটি বেগম, সৌকৎ জঙ্গ ও কয়েকজন রাজকর্মচারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। সিরাজের কাছে খবর আসে যে, এই ষড়যন্ত্রে কলকাতার ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ও নিযুক্ত আছে এবং তাকে সরিয়ে ইংরেজরা নিজেদের কোন ব্যক্তিকে সিংহাসনে বসানোর পরিকল্পনা করেছে।
৩. কৃষ্ণদাসকে আশ্রয়দান
ঘসেটি বেগমের প্রিয় পাত্র ঢাকার দেওয়ানা রাজবল্লভ আর্থিক তছরুপের দায়ে অভিযুক্ত প্রাপ্য অর্থপরিষদ করার নির্দেশ দিয়ে তাকে মুর্শিদাবাদের হাজির হতে বলেন। কিন্তু রাজবল্লভ নবাব কে রাজ্যের হিসাব ও প্রাপ্য অর্থ না দিয়ে পুত্র কৃষ্ণবল্লব বা কৃষ্ণদাসকে ধনরত্ন ও আত্মীয়-স্বজন সহ কলকাতায় ইংরেজ কর্তৃপক্ষের আশ্রয় পাঠিয়ে দেন। কৃষ্ণদাস কে ফেরত পাঠানোর জন্য সিরাজ ইংরেজদের নির্দেশ দিলে ইংরেজরা জানায় যে, কৃষ্ণদাস কে আশ্রয় দেওয়ার অধিকার ইংরেজদের আছে। এই ঘটনায় সিরাজ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন।
৪. দুর্গ নির্মাণ
ইংরেজি ফরাসি উভয় শক্তি দাক্ষিণাত্য যুদ্ধের অজুহাতে বাংলার দুর্গ নির্মাণ শুরু হয়। সিরাজ উভয় পক্ষকে দুর্গ নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দিলে ফরাসিরা দুর্গ নির্মাণ বন্ধ রাখে। কিন্তু ইংরেজরা নবাবের নির্দেশ উপেক্ষা করে কলকাতায় দুর্গ নির্মাণের কাজ আবহাহত রাখে। এই ঘটনার নবাব ইংরেজদের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্গ নির্মাণে সামরিক হস্তক্ষেপ করেন।
৫. দস্তকের অপব্যবহার
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সদস্য সতের খ্রিস্টাব্দে মোঘল সম্রাট ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে দস্তগ অর্থাৎ বাংলার বিনাশুল্কে মানিজ্য করার যে অধিকার পান্তা কোম্পানির কর্মচারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে থাকে। নবাব ইংরেজি ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দস্তক ব্যবহারের বিরোধিতা করে তাদের কাছে শুক্ল দাবি করলেও ইংরেজরা তাতে মোটেই কর্ণপাত করেনি।
৬. নারায়ন দাসের অপমান
কলকাতা ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করা, ইংরেজদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুক্ল প্রদান, কৃষ্ণ বল্লভ কে নবাবের হাতে ফেরত দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে সিরাজ তার দূত নারায়ন দাস কে কলকাতা ইংরেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। কিন্তু ইংরেজরা নারায়ন দাস কে গুপ্তচর ঘোষণা করে এবং অপমান করে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করেন। এতে নবাব প্রচন্ড অপমানিত হন।
উপসংহার
সিরাজউদ্দৌলা বিভিন্ন ঘটনায় ইংরেজদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠি এবং ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সহ কলকাতা দখল করেন। কলকাতায় অধিকাংশ ইংরেজ পালিয়ে গিয়ে দক্ষিণে ফলতায় আশ্রয় নেন। কলকাতা দখলের পর সিরাজ কলকাতা নতুন নাম রাখেন আলিনগর। তিনি মানিক চাঁদ কে কলকাতার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে মুর্শিদাবাদের ফিরে আসেন।