সূচনা : বিশ্বের পৌরাণিক কাহিনী গুলির মধ্যে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনীগুলি স্বতন্ত্র স্থান পেয়েছে। ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী গুলি অতীতকালে থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আজও প্রচলিত রয়েছে। বৈজ্ঞানিক মতে, পৌরাণিক কাহিনীগুলির কোন সত্যতা না থাকলেও এগুলির সাহিত্যমূল ও জনপ্রিয়তা যথেষ্ট। প্রাচীন পুরান গুলিতে বলা হয়েছে পূরণ হল পুরা কালের বিবরণ, যেহেতু পুরা কালে অর্থাৎ অতীতে এরূপ ঘটনা ঘটেছিল তাই এর নাম পুরান। পুরান শব্দের মূল অর্থ হলো প্রাচীন কাহিনী। বৈদিক সাহিত্যে আখ্যান, আখ্যায়িকা, উপাখ্যান, গাঁথা সবই পুরান বা ইতিহাস।
ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী সমূহ
(১) সমুদ্র মন্থন
মহাভারতে বর্ণনানুযায়ী অনুসরণের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ করে দেব তারা তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তাই তারা বিষ্ণুর কাছে গিয়ে শক্তি ও অমরত্ব লাভের পার্থনা করেন। বিষ্ণুদেবতার উপদেশ দেন সমুদ্র মন্থন করে অমৃত সংগ্রহ করার। সত্য যুগের দেবতা ও অনুসরণগণ ঠিক করেন যে তারা অমৃত পান করে অমর হবেন। অমৃত নামের আশায় তারা মন্দার পর্বতকে মন্থন দন্ড এবং সর্পরাজ বাসুকি কে রজ্জু করে ক্ষীরদসমুদ্রমন্থন করতে শুরু করেন। কয়েক হাজার বছর মন্ত্রণের পর লক্ষী দেবী অমৃত ভান্ডার নিয়ে সমুদ্র থেকে উঠে আসেন। অমৃতের অধিকার নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়। নারায়ণ মোহিনী রূপে পশুদের মোহিত করে অমৃত হরণ করেন। দেবতা গণ নারায়ণের কাছ থেকে সেই অমৃত পান করেন। অতঃপর দারুন যুদ্ধে ওষুধের পর আসতে করে দেবতাগণ ত্রিলোক অধিকার করেন।
(২) গঙ্গার মর্তের অবতরণ
পুরা কালে অযধ্যায় সগর নামে এক রাজা ছিলেন। কপিল মুনির অভিশাপে সগর রাজা ৬০ হাজার পুত্র ভস্মীভূত হয়ে যায়। সাগর রাজার পত্র অংশুমান কপিল মুনির আশ্রয়ে এসে জানতে পারেন স্বর্গ হতে গঙ্গাবতরণ কালে গঙ্গার জল এই মহরমের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে তারা পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবেন। গঙ্গা কে মত্তে নিয়ে আসার জন্য সগর রাজা, তার পুত্র অংশুমান, অংশুমানের পুত্র দিলীপ প্রত্যেককেই কঠোর তপস্যা শুরু করেন, কিন্তু তারা সকলেই ব্যর্থ হন।
অবশেষে দিলীপের পুত্র ভগিরথ কঠোর তপস্যা দ্বারা ব্রম্ভাকে সন্তুষ্ট করে নে এবং সর্ব থেকে গঙ্গা কে পৃথিবীতে আনার অনুমতি পান। কিন্তু গঙ্গার অবতরণ কালে তাকে ধারণ করার ক্ষমতা মহাদেবের ছাড়া আর কারোর ছিল না, তাই ভগিরথ মহাদেবের তপস্যা করে তাকে সন্তুষ্ট করেন। মহাদেবের গঙ্গা কে নিজের মাথায় ধারণ করেন। ভগিরথ কে অনুসরণ করে গঙ্গা সগল রাজার ৬০ হাজার সন্তানের ভস্মরআশইর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র জীবিত হয়ে ওঠেন।
(৩) অগস্থমুনির সমুদ্র শোষণ
মহাভারতের বোন পর্বের ১০৪ অধ্যায় অগস্থ্যমনের সমুদ্র শোষণের বিবরণ রয়েছে। বিত্রানুসার নিহিত হলে কালেও নামে অসুররাত্রি লোক বিনাশের সংকল্প নেই। তারা দিনের বেলায় সমুদ্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকতো এবং রাত্রেবেলা সমুদ্র থেকে উঠে এসে তপস্বীদের তপসয় বিষ্ণু ঘটাতো এবং দেবতাদের ওপর অত্যাচার করত। এভাবে দিনের পর দিন তারা অত্যাচারের মাত্রা বাড়ি চলে। দেবতা এবং ঋষিগণ অসুরদের এই অত্যাচারে হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একজন হয়ে অগস্থ্যমুনির শরণাপন্ন হন।
অগস্থ্যমুনির দেবতাদের অনুরোধ সমুদ্র পান করে ফেলেন, ফলে অসুররা নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। কালেও দানবদের সাথে দেবতার ভীষণ লড়াই শুরু হয়। দেবতাদের হাত থেকে অনেক অসুর নিহত হয়। অসুরানি নিহত হলে দেবতারা অগস্থ্যমুনির কে পুনরায় সমুদ্র ভরে দিতে বললে অগস্থ্যমুনির জানান যে তিনি সমস্ত জল হজম করে ফেলেছেন। দেবতারা তখন বিষ্ণু কে নিয়ে ব্রহ্মার কাছে যান। ব্রহ্মা বলেন ভগীরথ জন্মগ্রহণ করার পর তার প্রচেষ্টায় পুনরায় সমুদ্র পূর্ণ হয়ে উঠবে।
(৪) অনন্ত বা শেষ নাগের পৃথিবী বহন
নাগভ্যাংশের রাজা ও পাতালের অধিনায়ক হলেন অনন্ত বা শেষনাগ। নাগেদের মধ্যে অনন্ত বা শেষ না খোলেন সর্ব প্রধান। কদ্রুর গর্ভে ও কাশ্যপ মুনির অনুসারে এর জন্ম। অনন্ত দেবের অন্য দুটি নাম হল বাসুকী ও গোলক। বিষ্ণু পুরাণ মতে অনন্ত নাগ হলেন বলরামের অবতার। ভাইদের অসৎ ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের ত্যাগ করে অনন্ত না কঠোর তপস্যা করতে শুরু করেন। ব্রম্ভা তার তপসায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বরদেন এবং পৃথিবীকে তার মাথার ওপর এমনভাবে ধারণ করতে বলেন যাতে পৃথিবী বিচলিত না হয়।
ব্রহ্মা আরো বলেন পৃথিবীকে বহন করার কাজে গরুড় অনন্তকের সাহায্য করবেন। অনন্ত যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তখন সমস্ত পৃথিবী কেঁপে ওঠে, ভূমিকম্প হয়। পতিকল্পের শেষে শেষ নাগ মুখ থেকে আগুন বের করে সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংস করেন। কালিকাপুরাণ মতে প্রলয়ের শেষে নারায়ণ লক্ষীকে নিয়ে অনন্তের মধ্যম ঘণায় শয়ন করেন
(৫) ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও অনুসূয়া
দক্ষ প্রজাপতি ও প্রসূতির কন্যা তথা মহর্ষি অত্রির স্ত্রী ছিলেন অনুসূয়া। একদিন অনুসূয়ার সতীর্থ পরীক্ষা করার জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ব্রাহ্মণ মেশে অতিথি হয়ে তার কুঠিরে উপস্থিত হন। ব্রাহ্মণ বেশি এই তিন দেবতা অনুসূয়াকে বলেন যে পুত্ররূপে তাদের সেবার ব্যবস্থা করতে হবে নইলে তার আতিথ্য গ্রহণ করবেন না। অনুসূয়া তখন এই তিন ব্রাহ্মণরূপী দেবতার দেহে তার স্বামীর পাদোদক ছিটিয়ে বলেন “বালো ভবঃ” ।
অতঃপর এই তিনজন ব্রাহ্মণ শিশুতে পরিণত হলেন। তাদেরকে অনুসূয়া স্তন্য দুগ্ধ পান করা। অনুশুয়ার এই অপূর্ব মহিমায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর নিজ নিজ রূপ ধারণ করেন এবং অনুসূয়াকে বর পার্থনা করতে বলেন। অনুসূয়া বর হিসেবে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে পুত্ররূপে কামনা করেন। সতী অনুসূয়া এই ইচ্ছা পূর্ণ হয় তিন তিন পুত্রের জননী হন ব্রহ্মার অংশ হিসেবে সোম, বিষ্ণুর অংশ হিসাবে দত্তত্রেয়, এবং মহেশ্বর এর অংশ হিসাবে দুর্বাসা জন্ম নেয়।
(৬) অহল্যার কাহিনী
ব্রহ্মার মানস কন্যা ও শত নন্দের জননী হলেন অহল্যা। অদ্বিতীয় সুন্দরী ও সত্য পরায়ণ বলে ব্রহ্মা তার নাম দেন অহল্যা। ব্রহ্মা অহল্যা কে ঋষি গৌতম এর কাছে রেখে যান। গৌতমতি যত্ন সহকারে দেখাশোনা করে তাকে পবিত্র নিষ্কলঙ্ক অবস্থায় ব্রহ্মার কাছে ফিরিয়ে দেন। ব্রহ্মা এতে সন্তুষ্ট হয়ে গৌতমের সঙ্গে অহল্যার বিবাহ দেন। এদিকে দেবরাজ ইন্দ্র ভেবেছিলেন অহল্যা তার স্ত্রী হবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় এদিকে গৌতম স্নান করার জন্য আশ্রম থেকে বের হলে ইন্দ্র গৌতমের রুপ ধারণ করে অহল্যার কাছে যান এবং তার সঙ্গম প্রার্থনা করেন।
চিনতে পেরেও ইন্দ্রের প্রস্তাবে তিনি সম্মত হন। ইন্দ্র চলে যাওয়ার আগেই গৌতম এসে পড়ে। ঋষি গৌতম প্রথমে ইন্দ্রকে অভিশাপ দিয়ে বলেন তিনি নিপুংসক হবেন। আর অহলাকে গৌতম সহস্র বছর এখানে অদৃশ্য অবস্থায় বায়ুভ হয়ে অনাহারে পাথর হয়ে থাকার অভিশাপ দেন। পরে শান্ত হয়ে গৌতম বলেন রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে অহল্যা মুক্তি পাবে। পরে বিশ্বামিত্র মুনির প্রচেষ্টায় রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে অহল্যা মুক্তি পান।
(৭) সতী তুলসীর কাহিনী
সতী তুলসী হলেন কৃষ্ণ প্রিয়া রাধিকার সহচরী। স্বর্গে একদিন কৃষ্ণের সঙ্গে তুলসীকে ক্রীড়ারত দেখে রাধিকা তাকে মরতে মানবী হয়ে জন্মানোর অভিশাপ দেন। এতে কৃষ্ণ তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন মানবই রূপে জন্মালেও তপস্যার দ্বারা তুলসী কৃষ্ণের এক অংশ লাভ করবেন। রাধিকার রাধিকার সাপে মত্তের রাজা ধর্মধ্বজের স্ত্রী মাধবীর গর্ভে তুলসী জন্ম নেন। পরবর্তী সময়ে তুলসী কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত হন। তিনি ব্রম্ভার কাছে নারায়ণকে স্বামী রূপে কামনা করেন। ব্রহ্মা বলেন প্রথমে তুলসীকে কৃষ্ণের অঙ্গজাত সুদামা শ্রী হতে হবে, পরে তুলসী বিষ্ণুকে লাভ করবেন।
অপরদিকে রাধিকার সাপে সুদামা শঙ্খচুর দানব হয়ে জন্মান। যথাসময়ে শঙ্খচুরের সঙ্গে তুলসীর বিবাহ হয়। শঙ্খচূড়ের বর ছিল যে অন্য কারো দ্বারা তার স্ত্রী সতীত্ব নষ্ট হলে তবেই তার মৃত্যু হবে। শঙ্খচূড়ের হাত থেকে দেবতাদের রক্ষা করার জন্য শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধ লিপ্ত হন তবে নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে তুলসী সতীত্ব নাশ করেন। সব জানার পর তুলসী নারায়নকে শিলাখণ্ডে রূপান্তরিত হওয়ার অভিশাপ দেন। নারায়ণ বলেন তুলসী তার সঙ্গেই পূজিত হবেন। সেই মতে পূজার সময় নারায়ণ শিলার সঙ্গে তুলসী পাতা দেওয়া হয়।
(৮) নরসিংহের হিরণ্যকশিপু বধ
সত্য যুগে বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার হলেন নরসিংহ। অর্ধেক নর ও অর্ধেক সিংহ রূপ। গোলককে বিষ্ণুর ভক্ত দ্বার রক্ষক জয় ও বিজয় তিনবার নারায়ণের শত্রু রূপে জন্ম নেন। প্রথম জন্মে এরা যথাক্রমে হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু গ্রুপে জন্মান। হিরণ্যকশিপ ছিলেন দৈত্য রাজ। তিনি হরি বিদ্বেষী হলেও তার কনিষ্ঠ পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন হরি ভক্ত, ব্রহ্মার গড়েই হিরণ্যকৌশিপ মানুষ ও পশুর অবধ্য ছিলেন। প্রহ্লাদকে তিনি হরি ভক্ত দেখাতে নিষেধ করেন। কিন্তু প্রহ্লাদ তা না শোনাই তাকে হাতির পায়ের নিচে ফেলে বা অগ্নিকুণ্ডে বা সাগর গর্ভে নিক্ষেপ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন।
হিরণ্যকশিপু প্রহল্লাদ কে জিজ্ঞাসা করেন কে তাকে বরাবর রক্ষা করে? উত্তরে প্রহল্লাদ বলেন শ্রী হরি তাকে রক্ষা করেন। হিরণ্যকোষীপু আরো জিজ্ঞাসা করেন শ্রী হরি কোথায় আছেন? উত্তরে প্রহল্লাদ বলেন শ্রী হরি সর্বত্র বিরাজমান, এমনকি রাজসভার স্ফটিকস্তম্ভের মধ্যেও তিনি বিরাজমান। হিরণ্যকশিপু তখন স্ফটিকস্তভে পদাঘাত করেন। প্রহল্লাদের বাক্যমতের স্তম্ভ থেকে নরসিংহ মূর্তি প্রকাশিত হয়। নিজের জানুর ওপর হিরণ্য পশুকে স্থাপন করে নরকের দ্বারা বুক চিরে নরসিংহ হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেন। হিরণ্যকশিপু মৃত্যুর পর রোহল্লাদ রাজা হন।