মণ্ডলতত্ত্ব
কৌটিল্যের বিদেশনীতি বা কূটনীতির ধারণা গড়ে উঠেছে যে তত্বকে কেন্দ্র করে তা হল মণ্ডলতত্ত্ব বা প্রকৃতি মণ্ডলতত্ত্ব বা রাজমন্ডলতত্ত্ব এই তত্ত্বে ১২ ধরনের রাজার অবস্থান দেখা যায়।
[1] সম্মুখভাগ
- বিজিগীষু: রাজমণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রাজ্যের রাজা হলেন বিজিগীষু৷ এই রাজা হলেন সমস্ত কর্তৃত্বের উৎস,যিনি অন্য রাজাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে ইচ্ছুক।
- অরি: বিজিগীষু রাজার রাজ্যের সামনের ভাগের শেষপ্রান্তের রাজা হলেন অরি বা শত্ন (Enemy)। অতীত কালে অরি রাজ্যের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ বেশি হত।
- মিত্র: অরি রাজ্যের সামনের ভাগে অবস্থিত রাজ্যের রাজাই ছিলেন মিত্র। এই রাজা ছিলেন বিজিগীষু রাজার মিত্র ও অরির শত্রু।
- অরি মিত্র: মিত্র রাজার রাজ্যের সামনের দিকে অবস্থিত রাজ্যটির রাজা হলেন অরি মিত্র। ইনি হলেন শত্নুর মিত্র।
- মিত্র মিত্র: অরি মিত্র রাজ্যের সীমান্তবর্তী রাজা হলেন মিত্র মিত্র। ইনি মিত্ররাজার মিত্র অর্থাৎ স্বাভাবিক বন্ধু।
- অরি মিত্র মিত্র: মিত্র মিত্র রাজার সীমান্তবর্তী রাজা হলেন অরি মিত্র মিত্র। ইনি অরি মিত্রের স্বাভাবিক বন্ধু। ইনি বিজিগীষু রাজা এবং মিত্র মিত্রর শত্রু বা অরি।
[2] পশ্চাৎভাগ
- পার্ষিগ্রাহ: পার্ষি শব্দের অর্থ হল পশ্চাদভূমি। বিজিগীষু রাজার ঠিক পশ্চাদ্ প্রান্তের রাজ্যের রাজা হলেন পার্ষিগ্রাহ। ইনি বিজিগীষু রাজার শত্নু বা অরি।
- আক্ৰন্দ: পার্ষিগ্রাহ রাজ্যের ঠিক পশ্চাদ্বর্তী রাজ্যের রাজা হলেন আক্ৰন্দ। ইনি পার্ষিগ্রাহির স্বাভাবিক শত্রু এবং বিজিগীষুর একান্ত স্বাভাবিক মিত্র।
- পার্ষিগ্রাহাসার: আক্রন্দের ঠিক পশ্চাদূবর্তী রাজ্যের রাজা হলেন—পার্ষিগ্রাহাসার। ইনি আক্ৰন্দ এবং বিজিগীয়ুর স্বাভাবিক শর্টু কিন্তু পার্টিগ্রাদ্যে স্বাভাবিক মিত্র।
- আক্রন্দসার: পার্ষিগ্রাহাসার-এর ঠিক পশ্চাদ্বর্তী রাজ্যের রাজা হলেন আক্রন্দসার ইনি বিজিগীষু ও আক্রন্দের মিত্র কিন্তু পার্ষিগ্রাহ ও পার্ষিগ্রাহাসারের স্বাভাবিক শত্ৰু।
[3] মধ্যম: ‘মধ্যম’ শব্দের অর্থ হল মাঝখানে অবস্থানকারী। বিজিগীষু ও অরি এই দুই রাজার নিকটবর্তী রাজ্যের রাজা হলেন মধ্যম ইনি বিজিগীষু ও অরি উভয়ের মধ্যেকার শান্তি বা যুদ্ধর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন।
[4] উদাসীন: বিজিগীষু, অরি ও মধ্যম রাজার রাজ্যগুলির থেকে দূরে অবস্থানকারী রাজ্যের রাজা হলেন উদাসীন। ইনি অত্যধিক বলবান রাজা। ইনি বিজিগীষু, অরি ও মধ্যম রাজাদের মধ্যেকার শান্তি বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে সাহায্য বা প্রতিরােধে সক্ষম। এদের যৌথ বা একক আক্রমণের মােকাবিলা করতে ইনি সক্ষম।
মণ্ডলতত্ত্বের গুরুত্ব
[1] আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে মণ্ডলতত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। [2] বন্ধু ও শত্ন রাষ্ট্র নির্ধারণে কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব স্পষ্ট ধারণা দেয়। [3] মণ্ডলতত্ত্ব থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্বের (Balance of Power Theory) আভাস মেলে। [4] কোনাে একটি দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ বা বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে এই তত্ত্ব সাহায্য করতে পারে। [5] মণ্ডলতত্ত্ব জোটবদ্ধ রাজনীতির ধারণা দেয়, যার নিদর্শন আমরা দেখতে পাই আমাদের দেশ-সহ বিশ্বরাজনীতিতেও।
মন্তব্য: আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই তত্ত্বের স্পষ্ট প্রতিফলন মেলে। ভাবতে অবাক লাগে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে কৌটিল্য যে তত্ত্বের উদ্ভাবন করেছিলেন, আজও তা প্রাসঙ্গিক।