সূচনা : বিশ্ব ইতিহাসে আলেকজান্ডারের দি গ্রেট, জুয়েলাস সিজার, চেঙ্গিজ খান, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রমুখের হাত ধরে সাম্রাজ্যবাদের পথ চলা শুরু হলে ওই ধরনের সাম্রাজ্যবাদ ছিল আসলে ভৌমিক অধিকার লাভের প্রচেষ্টা মাত্র। এভাবে সাম্রাজ্যবাদের ধারা ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত আপাহত থাকে। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে মূলত ইউরোপের রাষ্ট্রগুলি এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলি দখল করে নিজেদের শাসনাধীনে আনলে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটে।
সাম্রাজ্যবাদের পর্যালোচনা
১. সংজ্ঞা
সংজ্ঞা নিয়ে নানা মত রয়েছে। সাধারণভাবে বলা যায় যে একটি দেশে নিজের স্বার্থে অন্য দেশের স্বাধীনতা ও সর্বপ্রথম বিনাশ বা সংকুচিত করে তার ওপর যে প্রভুত্ব বা প্রতিত ্ত তারপরে তা হল সাম্রাজ্যবাদ(Imperialism)। ভি.আই. লেনিন তার ‘Imperialism, the Highest Stage of Capitalism’ গ্রন্থ লিখেছেন- “সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের একচেটিয়া পর্যায়।” চার্লস বেয়ার্ড-এর মতে, “সাম্রাজ্যবাদ হলো কোন একটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃক অপর রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল এবং তার উপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা।”
২. উদ্দেশ্য
(১) অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ : প্রাচীনকালে রুম বাণিজ্যের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন প্রভৃতি নৌ শক্তিধর রাষ্ট্রীয়গুলি শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত পন্নী রপ্তানির লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করে। তাই এক কথায় বলা যায় সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ।
(২) জাতীয়তাবাদের প্রসারণ : একটি দেশ অন্য দেশের ওপর ভাষা ও সংস্কৃতি অধিপত্য ঘটিয়ে আত্মতুষ্টি লাভ করে থাকে। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার, অভিভাবকত্বের মানসিকতা আবার অনেক সময় কোন দেশের শাসক নিজের শৌর্যবীর্যের প্রমাণ রাখার জন্য বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে। জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টার ফলে ও সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটেছে।
(৩) জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা : অনেক সময় কোন দেশ জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখে নিজে নিজে রাষ্ট্রের সীমানার বৃদ্ধির চেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্যে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সামরিক ও নৌকাটি স্থাপন করতে থাকে। অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করে নিজের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে আনতে সচেষ্ট হলে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে।
(৪) জনসংখ্যার সংকুলান : অনেক সময় বধিত জনসংখ্যায় পূর্ণবাসন ও সংকলনের লক্ষ্যে অন্য দেশকে প্রদানত করা হয়। জার্মানি, জাপান, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশ ওই ধরনের অজুহাত দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটিয়েছে।
(৫) ধর্ম ও সভ্যতার আদর্শ প্রচার : শুভ্রাজী নদীর থেকে ইউরোপীয় যে সুইট এবং খ্রিস্টান নগদ খ্রিস্টধর্ম এবং ইউরোপীয় সভ্যতার আদর্শ প্রচারে লোককে বহু অজানা দেশ পাড়ি দেয়। পরবর্তীকালে এদের অনুসরণ করে বনিক গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক নেত্র পর্বের প্রচেষ্টায় সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।
৩. বিকাশের বিভিন্ন স্তর
সাম্রাজ্যবাদ মূলত তিনটি স্তরে বিকশিত হয়। এগুলি হলো-
(১) প্রাথমিক স্তর : কলম্বাসের ভৌগোলিক অভিযান থেকে শুরু করে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দের সপ্তদশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ পর্যন্ত সময়কাল হল সাম্রাজ্যবাদ বিকাশের প্রাথমিক স্তর।
(২) দ্বিতীয় স্তর : এই স্তরের সময়কাল আনুমানিক ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত।
(৩) তৃতীয় স্তর : এই স্তরের সময়কাল আনুমানিক ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান কাল পর্যন্ত।
৪. সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপ
সাম্রাজ্যবাদের মূল তিনটি রূপ হল –
(১) সামরিক সাম্রাজ্যবাদ : আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ন, হিটলারের মতো সমর বিজেতা গন সামরিক বিজয়ের মধ্যে দিয়ে অন্য রাষ্ট্রের দখল নিয়েছেন। পরবর্তীকালে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ নিজ জোট গড়ে তুলে জোটবদ্ধ দেশকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে।
(২) অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ : শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপীয় দেশগুলি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ এর উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করেছে। হরতাল শিল্পের প্রয়োজনীয়তা কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদিত শিল্প পণ্য বিক্রয় লক্ষ্য নিয়ে উপনিবেশিক গুলিতে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে।
(৩) সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদ : সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সংস্কৃতির ভাব বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে নিজে নিজে দেশের সংস্কৃতি প্রসার ঘটানো। অর্থাৎ অন্য দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্য, অধিবাসের রুচিবোধ, পছন্দ ও অপছন্দের দিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টায় এই হলো সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদ।
সাম্রাজ্যবাদের তাৎপর্য
বিশ্ব ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা –
(১) ইউরোপের দেশগুলি এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্রাজ্য গঠনের মধ্যে দিয়ে ইউরোপীয় সভ্যতা সংস্কৃতি প্রসার ঘটায়।
(২) আর্থিক শোষণ তথা সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য নিয়েই ইউরোপীয় দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটায়। উপনিবেশ গুলি থেকে অর্থ শোষণ ও সম্পদ লুণ্ঠন ছাড়াও কাঁচামালের আমদানি ও পণ্যের রপ্তানি ছিল সাম্রাজ্যবাদের আসল লক্ষ্য।
(৩) ইউরোপীয় দেশগুলি উপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত হয়। এরকম ভাবেই দূরপ্রাচ্যে ছবির আগ্রাসন রোধের লক্ষ্যে জাপান অগ্রসর হলে রুশো জাপান দ্বন্দ্ব বাধে।
(৪) পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইউরোপীয়দের উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা হলে ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সামুদ্রিক বাণিজ্যের সূত্রপাত ঘটে। পলি ইউরোপের বাণিজ্য আরো সমৃদ্ধ হয়।
(৫) দক্ষিণ আমেরিকার সোনা ও রুপাসহ বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে সম্পদ আমদানির ফলে ইউরোপের একশ্রেণীর বণিকদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ জমা হয়। এভাবে পুঁজিপতি ও ক্যাপিটালিস্ট শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে।