ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা প্রভাব
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে জয় লাভের পর থেকে পরবর্তী ১০০ বছরে ভারতের সুবিস্তৃত অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা দেওয়ালি অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। লর্ড কর্নওয়ালিস ৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বৃহদংশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে। এছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে বেশ কিছু অংশের রায়তওয়ারি, গাঙ্গেয় উপত্যকা, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও মধ্য ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে মহলওয়ারী এবং পাঞ্জাবে ভাইয়াচারি নামের ভূমি ব্যবস্থা চালু করে। ভারতীয় সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্রিটিশ রাজ্য ব্যবস্থার যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল। যেমন –
১. কৃষকের অধিকার বিলুপ্ত
কোম্পানির ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার জমিতে সরকার বা কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের অনুগত জমিদারের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক জমিতে তার স্বত্ব বা অধিকার হারিয়ে একপ্রকার ভাড়াটিয়ার প্রজার পরিণত হয়। তারা ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের প্রজা এবং রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে সরকারের প্রজা। জমিদার ও সরকারের কর্মচারী রাজস্ব আদায় প্রচার ওপর তীব্র অত্যাচার চালাতেন। রায়তওয়ারি ব্যবস্থা কৃষকের জমির মালিক বলে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে জমির উপর কৃষকের অধিকার ছিল খুবই সামান্য।
২. রাজস্বের উচ্চ হার
ব্রিটিশ কোম্পানি প্রবর্তিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা কৃষকদের ওপর উচ্চ হারে ভূমি রাজস্ব চাঁপানো হয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পূজার কাছ থেকে জমিদারের ইচ্ছা মতো রাজস্ব আদাই করতে পারতেন। নির্ধারিত রাজস্ব ছাড়াও জমিদার নানা অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় উৎপন্ন ফসলের ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো। কৃষকরা এই বিপুল পরিমাণে রাজস্ব পরিষদের প্রায়ই ব্যর্থ হত। রাজস্ব পরিষদের অর্থ কৃষকের কখনো জমিদার, কখনো গ্রামের প্রধান, কখনো সরকারি কর্মচারীদের শোষণ ও অত্যাচারের শিকার হতে হতো।
৩. জমি থেকে উৎখাত
ব্রিটিশ ভূমি রাজ্য ব্যবস্থায় জমিতে কৃষকের মালিকানা স্বীকৃতি না হওয়ায় তারা জমি থেকে সর্বদা উৎখাতের আশঙ্কায় ভুগত। কৃষকের ওপরে যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব চাঁপানো হতো তা পরিষদের ক্ষমতায় কৃষকের থাকতো না। এরপর জমিদারের বা রাজস্ব আদায়কারীরা নানা অজুহাতে নির্ধারিত রাজো এসেছে অনেক বেশি রাজস্ব পরিষদের জন্য কৃষকের উপর অত্যাচার চালাত। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে শস্য হানি হলে কৃষককে রাজস্ব মকুব হতো না। এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পরিষদে ব্যর্থ হয়ে কৃষকরা ঘন ঘন জমি থেকে উৎখাত হত।
৪. জমিদারের ক্ষমতা বৃদ্ধি
মোঘল আমলে জমিদাররা জমির মালিক ছিল না, তারা শুধু রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করত। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে তাদের ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। তারা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ভূস্বামী বা জমির মালিক কে পরিণত হয়। জমি তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয় এবং জমিদারের জমি বিক্রয়, দান বা বন্ধক রাখার অধিকার লাভ করেন। এর ফলে কৃষকের ওপর জমিদারের সীমাহীন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫. মহাজনদের শোষণ
ব্রিটিশভূমি রাজ্য ব্যবস্থায় কৃষকদের ওপর চাপানো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব নগদ অর্থে পরিষদ করতে হতো। রাজস্ব পরিষদ করার উদ্দেশ্যে কৃষকরা মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদের ঋণ নিতে বাধ্য হয়। ঋণদায়ের কৃষকের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মহাজনের কাছে বাধা পড়ে যেত। কৃষক শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণদাতা মহাজন তার সর্বস্ব দখল করে নিত। এভাবে দরিদ্র কৃষক ভুমিদাসে পরিণত হতো।
৬. মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান
জমিদার প্রত্যক্ষভাবে কৃষকের কাছে থেকে রাজস্ব আদাই না করে তার অধস্তন কর্তৃপক্ষের হাতে এই দায়িত্ব দিত। এভাবে জমিদার ও কৃষকের মাঝখানে অত্যন্ত ৫-৬ জন মধ্যস্বত্বভোগী বা উপস্বত্বভোগী আবির্ভাব ঘটে। কৃষকের উপর তীব্র অত্যাচার চালিয়ে যতটা বেশি সম্ভব রাজস্ব আদাই করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ। এই অর্থ দিয়ে তারা শহরে বিলাসবহুল জীবন কাটাতো। তারা ইংরেজি ও আধুনিক প্রাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে আধুনিক ধারায় দীক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে এরা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অংশ পরিচিত হয়।
উপসংহার
লেডিস রাজস্ব ব্যবস্থায় ভারতের গ্রামীণ জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থার ফলে ভারতের চিরাচরিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এবং নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উদ্ভব ঘটে। গ্রামীণ যৌথ পরিবার গুলি ও পঞ্চায়েতে ব্যবস্থা ভাঙতে থাকে এবং কুটির শিল্প ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে গেলে দরিদ্র কৃষকের পক্ষে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। অনদিকে গ্রামীণ সমাজে নায়েক, গোমস্তা, মহাজন কমিটির সংখ্যা ও আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। এভাবে গ্রাম জীবন এক সামাজিক বিপ্লব ঘটে যায়।