উনবিংশ ও বিংশ শতকের উপনিবেশবাদের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করো?

সূচনা : আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। অতীত থেকে কখনো ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের টানে আবার কখনো বা অন্য দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের আকর্ষণে, আবার কখনো ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে এক দেশের মানুষ অন্য দেশে অনুপ্রবেশ ঘটলে উপনিবেশবাদের প্রেক্ষাপট রচিত হয়। মূলত ইউরোপীয় নবজাগরণের পর থেকেই উপনিবেশবাদের উদ্ভব ঘটে।

উপনিবেশবাদের পর্যালোচনা

১. উৎস

উপনিবেশবাদ বা ‘Colonialism’ শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘Colonia’ থেকে যার অর্থ হলো বিশাল সম্পত্তি বা এস্টেট। উপনিবেশ শব্দের মূল অর্থ হলো মানব সমাজের একটি স্থানান্তরিক অংশ। নৌশক্তিতে শক্তিশালী ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, হল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলি এশিয়া, আফ্রিকার সর্বপ্রথম উপনিবেশ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

২. সংজ্ঞা

সাধারণভাবে বলা যায় কোন দেশ যদি অন্য দেশের ভূখণ্ড বা অঞ্চলকে নিজের অধীনস্থ করে নেয় তবে সে অঞ্চলটিকে বলা হয় বিজয়ী দেশটির উপনিবেশ। Encyclopedia of Sciences গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপনিবেশবাদ হলো অন্য দেশের ভৌগলিক অঞ্চলের ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা করে ধীরে ধীরে সেখানকার অর্থনীতি, রাজনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। জে. এ. হবসনের মতে, “সঠিক অর্থ উপনিবেশবাদ হলো জাতীয়তাবাদের এক স্বাভাবিক বহিঃসম্প্রসারণ।” এমার্সন-এর ভাষায়, “উপনিবেশিক কথা হল কোন বিদেশী জনগণের উপর দীর্ঘ সময় ধরে শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তা বজায় রাখার ব্যবস্থা।” অর্থাৎ, উপনিবেশবাদ হল ভৌগলিক সীমা পেরিয়ে অন্য দেশের উপর অধিকার স্থাপন, শোষণ, রক্ষণ, অর্জন এবং বিস্তার।

৩. প্রকৃতি

প্রকৃত বিচারে উপনিবেশবাদের তিনটি রূপ পার্থক্য করা যায়, যথা সামরিক বা রাজনৈতিক রূপ অর্থনৈতিক রূপ ও সংস্কৃতিক রূপ। এশিয়া, আফ্রিকা এক লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশগুলিতে ব্রিটিশ, ফরাসি ওলন্দাজ, স্পেনীয় নাবিকগণ প্রথম সম্পদ সংগ্রহ বাণিজ্যক মুনাফা অর্জন, ভৌগলিক আবিষ্কার প্রকৃতির মূল উদ্দেশ্য হলেও গ্রামের নতুন দেশগুলি দখল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে ধীরে ধীরে নতুন দেশগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের ওপর নিজেদের শাসন চাপিয়ে দেয়। কিভাবে বিজিত সেই ভাবেই দেশগুলি শক্তিশালী এবং বিজয়ী ইউরোপীয় দেশ গুলির উপনিবেশ পরিণত হয়।

৪. উপনিবেশ স্থাপনের কারণে

(১) বৃহৎ শক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা : অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা রয়েছে এমন অঞ্চলগুলি নিজেদের দখলে নিউরোপীয় দেশগুলি আরো সম্পদশালী হয়ে ওঠার উদ্যোগ নেয়। ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদের সূচনা কালের মার্কেনটাইল বাদ একটি নামে একটি অর্থনৈতিক মতবাদ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিকে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা যোগায়। বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধায় লাভ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ প্রভৃতি দেশ গুলি বিবেচনা করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগালসহ কয়েকটি দেশ বৃহস্পতি হিসেবে মাদ্রাজে লাভের আকাঙ্খায় প্রকাশ করে, ফলস শ্রুতি হিসেবে উপনিবেশ গড়ে ওঠে।

(২) উদ্বৃত্ত মূলধন : পুঁজিবাদী দেশগুলির মূলধনী গোষ্ঠী অধিক মুনাফার জন্য নিজ নিজ দেশের সরকারের ওপরে উপনিবেশ দখলের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। মূলধনের স্থীতি পরোক্ষভাবে উপনিবেশবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপট রচনা করে। এক্ষেত্রে শিল্প বিপ্লব ও ধনতন্ত্রবাদ উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে।

(৩) পুঁজিবাদের প্রসার : ইংল্যান্ড সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্প বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পর পুঁজিবাদী অর্থনীতির গুরুত্ব বাড়ে। দেশে এবং বাইরে বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে পুঁজির বিনিয়োগ শুরু হয়। পুঁজিবাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল আরো মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রসার ঘটানো। পুঁজিবাদের এই সুষ্ঠু প্রসারের জন্য উপনিবেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।

(৪) সামরিক শক্তিবৃদ্ধির প্রচেষ্টা : অনেক সময় অধিকৃত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণে রেখে সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে সমর বাহিনী গঠন করা হয়। এছাড়াও দখলইকৃত অঞ্চলটিকে ঠিকমতো শাসন করার জন্য সেখানকার লোকেদের নিয়ে সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়। এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা উপনিবেশের জন্ম দেয়।

(৫) আমদানি-রপ্তানি : এক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- (i) কাঁচামাল সংগ্রহ, (ii) উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগ এবং (iii) উদ্বৃত্ত পণ্য সামগ্রী বিক্রিয়ের বাজারে। তবে কোন অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন না করেও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে কাজামাল সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু পুঁজে বিনিয়োগ এবং পণ্য বিক্রির বাজার দখলের জন্য অবশ্যই উপনিবেশ দখলের প্রয়োজন ছিল।

৫. প্রভাব

উপনিবেশবাদের প্রভাবে এদিকে যেমন বাণিজ্যিক শক্তিগুলো শাসক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, অপরদিকে তেমন স্বাধীন দেশগুলি উপনিবেশের রূপ নেয়। উপনিবেশ গুলি থেকে উপনিবেশিক শক্তি একনাগারে অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন করে। ঠিকমত শোষণ আর শাসনের লোককে উপনিবেশ ঔপনিবেশিক শক্তি নিজের স্বার্থে নানা ধরনের দাবনমূলক আইন প্রবর্তন করে এবং গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করে।

৬. উপনিবেশবাদের অবসানের কারণ

বেশ কয়েকটি কারণে ঔপনিবেশবাদের অবসান ঘটে, যথা -জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, শিক্ষিত সম্প্রদায়ের উদ্ভব, জাতীয়তাবাদী চেতনা, বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয় ক্ষতিকর প্রভাব, মার্কিন ও সোভিয়েতের ভূমিকা, রাষ্ট্র সংঘের গঠন, নির্জোট আন্দোলন ইত্যাদি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন উপনিবেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিরোধী এই মুক্তি সংগ্রাম চরমে পৌঁছালে উপনিবেশিক শক্তি গুলি উপনিবেশবাদীদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment