ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক ভারত ও চীনে উপনিবেশিক শোষণের আধিপত্যের মধ্যে বৈসাদৃশ্য গুলি উল্লেখ করো ?

ঔপনিবেশ শোষণ বিষয়ে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বৈসাদৃশ্য

ইউরোপের বিভিন্ন উপনিবেশিক শক্তি ভারত ও চীনে ব্যাপকভাবে উপনিবেশিক শোষণ চালায়। উপনিবেশিক শোষণের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তবে উভয় দেশের মধ্যে উপনিবেশিক শোষণের অভিজ্ঞতা বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। ভারতের চীনের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে বৈসাদৃশ্য গুলি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল-

ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতার বৈসাদৃশ্য

ভারত

১. নিষেধাজ্ঞা : সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকে ইউরোপ থেকে ভারতে আসা বণিকদের বাণিজ্য করার বিষয় কখনো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ছিল না। বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তি এ দেশে বাণিজ্য কুঠি প্রতিষ্ঠার অনুমতি পেয়েছিল কেন। (১) পর্তুগিজার কালিকট, কোচিন, গোয়া, দমন, দিউ, বোম্বাই, হুগলি। (২) ওলন্দাজ পুলিকট, সুরাট, নেগাপটম, কোচিন, চুঁচুড়ায় (৩) ইংরেজরা সুরাট, আগ্রা, আহাম্মদনগর, মাদ্রাজ, কলকাতা, (৪) ফরাসিরা সুরাট, মুসলিপটম, পন্ডিচেরি, মাহে প্রভৃতি স্থানের কুঠি স্থাপন করে।

২. আধিপত্যকারী দেশ : প্রথম দিকে পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও ডেনমার্ক প্রভৃতি ইউরোপীয় রাষ্ট্র ভারতে বাণিজ্য কুঠি প্রতিষ্ঠা করে। শেষ পর্যন্ত অন্যান্য শক্তি গুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারি ইংরেজরা এদেশে নিজেদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

৩. বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার : ব্রিটিশ কোম্পানি ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মোঘল বাদশাহা ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে দস্তক বা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা বিনা শুল্ক বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। এর ফলে তারা অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক এবং ভারতের দেশীয় বণিকদের চেয়ে অনেক বাড়তি সুবিধা পায়।

৪. দেওয়ানী অধিকার : ব্রিটিশ কোম্পানি এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধির ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের দ্বারা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় সাহা আমলের কাছ থেকে দেওয়ানি অর্থাৎ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। এই রাজস্ব তারা ভারতে বাণিজ্যের পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করে।

৫. আধিপত্যের প্রকৃতি : পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধে জয় লাভের দ্বারা ইংরেজরা বাংলা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে তারা অযোধ্যা, মারাঠা, মহীশূর, পাঞ্জাব সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিভিন্ন যুদ্ধ ও সন্ধির মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ভারতে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিটিশ উপনিবেশ পরিণত হয়।

৬. আন্দোলনের নেতৃত্ব : ভারতের ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের আন্দোলন গড়ে তুললেও এতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল জাতীয় কংগ্রেস দল। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দল ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল।

৭. উপনিবেশিক প্রভাবের অবসান : ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে গান্ধীজি নেতৃত্বে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে, আইন অমান্য আন্দোলন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে, সুভাষচন্দ্র বসু নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রাম, নৌ বিদ্রোহ হাজার ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে প্রভৃতি ঘটনার ব্রিটিশের ভারত ছাড়তে বাধ্য করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

চীন

১. নিষেধাজ্ঞা : অষ্টাদশ শতকে প্রায় মধ্যভাগে পর্যন্ত ইউরোপ থেকে চীন আসার বণিকদের বাণিজ্য এক প্রকার নিষেধ ছিল। কোন বিদেশি দুধ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে চীন সম্রাটের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলে চীন সম্রাট নজরানা বা উপঢৌকন দিতে হতো এবং কাও তাও প্রথা অনুসারে সম্রাটের সামনে আভূমি মাথা নত করতে হতো। এসবের পরেও চীনে বাণিজ্য অনুমতি মিলল না।। চীনে বিদেশীদের প্রবেশ এই বাধা রুদ্ধ দ্বার নীতি নামে পরিচিত হলো।

২. আধিপত্যকারী দেশ : চীনে বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে ইংরেজরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ঠিকই তবে অন্যান্য শক্তি গুলি আধিপত্য সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়নি। ব্রিটেনের পর চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল আমেরিকা। এছাড়া ফ্রান্স, রাশিয়া, জাপান, ওলন্দাজ প্রভৃতি দেশগুলি চিনে কিছু না কিছু আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

৩. বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার : ইংরেজরা ভারতের মতো চীন দস্তক বা বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার পাইনি। ফলে তারা চীনের বাণিজ্য অন্যান্য বহিরাগত বণিক জাতির চেয়ে শুল্ক সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা পায়নি।

৪. দেওয়ানী অধিকার : ইংরেজ বা অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক জাতিগুলি চীনে দেওয়ানী বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করতে পারেনি। ইংরেজ বণিক চীনের বাণিজ্যের অন্যান্য বহিরাগত বণিক জাতি চেয়ে শুল্ক-সংক্রান্ত বিশ্বাসের সুবিধা পাননি। তবে তারা চীনে কম শুল্কে বাণিজ্য করার সুযোগ পেয়েছিল। ফলে এই বণিক জায়গা গুলি চীনের বাণিজ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন নিজে নিজে দেশ থেকে আনতে বাধ্য হয়।

৫. আধিপত্যের প্রকৃতি : ইউরোপের শক্তি গুলি চীনের কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করে। সমগ্র চিনে শাসন ক্ষমতা তারা দখল করতে পারেনি। আইনগত রাজারাই ছিলেন চীনের শাসক। তাই চীনকে বিদেশি শক্তি গুলির পূর্ণাঙ্গ উপনিবেশ না বলে আধা উপনিবেশ বলা যায়।

৬. আন্দোলনের নেতৃত্ব : চীনে বিভিন্ন দেশীয় বণিক জাতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত চীন কমিউনিস্ট পার্টি। মাও সে তুং এ নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি চীনের আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল।

৭. উপনিবেশিক প্রভাবের অবসান : ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের পর মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে চেইন কমিউনিস্ট পার্টি কোশ্চেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি গুলির অনুগত চীনের কুয়োমিন তাং দলের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কুয়োমি তুং দল পরাজিত হয় এবং মাও সে তুং ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ১ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা করেন।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment