ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক ভারত ও চীনে উপনিবেশিক শোষণের অভিজ্ঞতার মধ্যে সাদৃশ্য গুলি উল্লেখ করো?

উপনিবেশিক শোষণ বিষয়ে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সাদৃশ্য

ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী বণিক জাতীয় অষ্টদশ শতকে এশিয়ার যেসব দেশে বাণিজ্যিক একাধিক পত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ভারত ও চীন। ইউরোপীয় বণিক জাতি গুলি উভয় দেশের অর্থনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বিদেশী আদিত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, যেমন-

ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতা সাদৃশ্য

ভারত

১. বিদেশীদের আগমন : পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো+১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ থেকে জলপথের প্রথম ভারতে কালিকট বন্দর এসে পৌঁছান। এই পথ ধরে পরবর্তীকালে ইউরোপের পর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসি, ডাচ, দিনেমার প্রভৃতি বণিক জাতির ভারতে বাণিজ্য করতে আসে।

২. বিদেশি আধিপত্য : পশ্চিম বণিক জাতি গুলি ভারতের সফল বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয় এবং ভারতে বিভিন্ন অংশের সেনাবাহিনী গড়ে তুলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

৩. প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ : ইংরেজিটা প্রথম ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা কে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলা নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

৪. ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠত্ব : ভারতে আসা ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষ পর্যন্ত নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসি শক্তিকে পরাজিত করে ব্রিটেনে এসে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।

৫. বিদেশি সামগ্রীর বাজার : ইউরোপের শিল্প জাত পণ্য সামগ্রীতে ভারতে বাজার ছেয়ে যায়। এই পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছু করতে ভারতের শিল্প ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়।

৬. কাঁচামাল রপ্তানি : বিদেশি শক্তি গুলি, বিশেষ করে ব্রিটেন ভারতবর্ষকে একটি কাঁচামাল রপ্তানিকার দেশে পরিণত করে। তারা ভারতে কাচা তুলো, পশম, রেশম, পাট, চা, কফি, হাতির দাঁত, চন্দন কাঠ, রূপক প্রভৃতি পণ্য ইংল্যান্ডের রপ্তানি করতো। ভারতে আফিমের অধিকাংশ চীনে রপ্তানি করা হতো।

৭. চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক সংগ্রহ : ব্রিটিশ সরকার ভারত থেকে বহু চুক্তিবাদের শ্রমিক দীর্ঘকাল ধরে আফ্রিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কৃষি ও খনিজ উৎপাদনে কাজে পাঠাতে থাকে।

৮. অসম চুক্তি : ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের ওপরে ছাপানো কয়েকটি অসম চুক্তি হলো আলিনগরের সন্ধি, এলাহাবাদের প্রথম ও দ্বিতীয় সন্ধি, ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি, সলবাইয়ের সন্ধি, বেসিনের সন্ধি প্রভৃতি।

৯. অর্থনৈতিক শোষণ : ইংরেজ কোম্পানির ভারতে বৃহদংশে তীব্র শোষণ মূলক ভূমি ব্যবস্থা চালু করে। তাছাড়া বিলাতি পূর্নি ভারতের বাজারগুলি ছেড়ে গেলে দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয় এবং শিল্প কারিগররা বেকার হয়ে পড়ে।

১০ দেশীয় বাণিজ্য ধ্বংস : ভারতে বাণিজ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের দখল করে চলে যায়। ফলে ভারতের দেশীয় বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১১. সম্পদের বহির্গমন : ভারতের বিপুল পরিমাণে রাজস্ব কাঁচামাল এবং বাণিজ্য থেকে প্রাপ্ত অর্থ সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে বিলাতে চলে যেতে থাকে। ফলে ভারতের দারিদ্র বৃদ্ধি পায়।

১২. বিদ্রোহ : ভারতের শোষিত ও নির্যাতিত প্রচার অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার, ভারতে জমিদার ও মহাজন্দের বিরুদ্ধে বারংবার আন্দোলনে শামিল হয়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ছিল কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, রংপুর বিদ্রোহ, ওয়াহাবি আন্দোলন, মহাবিদ্রোহ, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, ভারতছাড়ো আন্দোলন প্রভৃতি।

চীন

১. বিদেশীদের আগমন : পর্তুগিজ বণিক রাফায়েল পেরস্ট্রেল ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ থেকে জলপথে চিনে এসে পৌঁছায় এবং এখানে বাণিজ্য করে বিশেষ লাভবান হন। তা সাফল্যের সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে স্পেনীয়, ওলন্দাজ ইংরেজ, ফরাসি, দিনেমার ও আমেরিকান প্রভৃতি বহিরাগত জাতি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চীনে আসেন।

২. বিদেশি আধিপত্য : বহিরাগত জাতি গুলি আরোপ করা বিভিন্ন চুক্তির চাপে চিন্তার বিভিন্ন বন্দর বাণিজ্যের জন্য বিদেশীদের কাছে খুলে দিতে বাধ্য হয়। এরপর তারা বিভিন্ন বন্দর ও অন্যান্য অঞ্চলে নিজেদের একাধিকপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

৩. প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ : ইংরেজিটা প্রথম আফিম যুদ্ধ বা প্রথম ইঙ্গ-চীন যুদ্ধে ১৮৪৯-৪০ খ্রিস্টাব রেসিন কে পরাজিত করে নানকিং এর সন্ধি ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরে বাধ্য করার পর চীনে আধিপত্যের সূচনা করে।

৪. ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠত্ব : চীন বাণিজ্য করতে আসা বিদেশি শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনেন্স শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।

৫. বিদেশি সামগ্রীর বাজার : বিদেশীরা ভারতের মতো চীন কেউ বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত করে। বিদেশের কলকারখানায় উৎপাদিত পণ ও চীনে আমদানি করা হতো। এই পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চীনের শিল্প পিছিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ মনিরা ভারত থেকে চীনে আফিম রপ্তানি করতো।

৬. কাঁচামাল রপ্তানি : বিদেশী শক্তি গুলি চীনকে ও একটি কাঁচামাল রপ্তানিকার দেশে পরিণত করে। চীনের মূল্যবান সাদা রেশম, সবুজ চা, বিদেশি খনিজ পদার্থ, চীন মৃৎপাত্র, ওষুধ ও দারুচিনি প্রভৃতি থেকে ইউরো রপ্তানি করতো।

৭. চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক সংগ্রহ : হৃদিশা ভারতের মতো চীন থেকেও প্রচুর যুক্তিবদ্ধ শ্রমিক সংগ্রহ করে আফ্রিকা সহ বিভিন্ন অনুন্নত স্থানীয় কৃষি ও খনিজ উৎপাদনের কাজে পাঠায়।

৮. অসম চুক্তি : ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক চীনের ওপর চাপানো কয়েকটি অসম চুক্তি হলো- নানকিং এর সন্ধি, বর্গ এর সন্ধি, টিয়েনসিনের সন্ধি, পিকিং এর সন্ধি, শিমনোশেকির সন্ধি প্রভৃতি।

৯. অর্থনৈতিক শোষণ : চীনের বিভিন্ন বন্দর বিদেশিদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়লে সমগ্র চীন বিদেশী পণ্য ছেড়ে যায়। দামি ও মানি বিদেশিদের যন্ত্রে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চীনের কুটির শিল্প ধ্বংস হয় এবং শিল্পী ও কারিগররা বেকার হয়ে পড়ে।

১০. দেশীয় বাণিজ্য ধ্বংস : বৈদেশিক শ্বসনের চীনের বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ, আমেরিকা ও অন্যান্য বিদেশী বণিকদের দখলে চলে যায়। ফলে চিনে দেশীয় বাণিজ্য ধ্বংস হয়।

১১. সম্পদের বহির্গমন : বিদেশি বণিকরা চীনের বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, অর্থ, খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ অবিরাম নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। ফলে ক্রমে চিনির অর্থনৈতিক দুর্দশা বৃদ্ধি পায়।

১২. বিদ্রোহ : চীনে বিদেশি বণিকদের শোষণ এবং মাঞ্চু রাজ বংশের অপশনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ আন্দোলনে সামিল হয়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ছিল তাইপিং বিদ্রোহ, বক্সারের বিদ্রোহ, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লব, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ৪ মে আন্দোলন, ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রভৃতি।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment