ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশের উপনিবেশিক নীতি পর্যালোচনা করো?

ভূমিকা

মূলত শিল্প বিপ্লবের পর থেকে ইউরোপের দেশ গুলি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশে প্রতিষ্ঠা শুরু করে। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে কিছুকাল উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রপতি ও জনমত কিছুটা বিরূপ ছিল। এই সময়ের ইউরোপের বহু উপনিবেশিক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। তবে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের সেডানের যুদ্ধের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী প্রয়াস ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে উত্তাল করে তুলেছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেনের মতো নৌ শক্তিতে শক্তিশালী দেশগুলির হাত ধরেই বিশ্বে উপনিবেশবাদে সূচনা ঘটে। তবে পরবর্তীকালে আমেরিকা, রাশিয়া, জার্মানির মতো আর্থিক বা সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশ গুলি ও উপনিবেশ গঠনে উদ্যোগী হয়। এই সমস্ত দেশগুলির উপনিবেশ গঠনের উদ্দেশ্যে এক হলেও এদের উপনিবেশিক নীতি ছিল আলাদা আলাদা।

ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক নীতি

১. প্রকৃতি

প্রকৃতগত বিচার ইউরোপের চার ধরনের সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল। এই সমস্ত দেশগুলির ঔপনিবেশিক নীতিও ছিল আলাদা আলাদা, যথা-

(১) পর্তুগাল, স্পেন ও হল্যান্ড ছিল এমন তিন দেশ, যার উপনিবেশ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যুগের সূচনা কাজে অগ্রহীন ভূমিকা পালন করেছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এদের উপনিবেশিক আধিপত্য ১৯ শতকের শেষপাদে ব্রিটেন, জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্নান হয়ে যায়।

(২) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ছিল এমন দুই দেশ যার বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়ে উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নামলেও পড়ে সাম্রাজ্য স্থাপনকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ইউরোপের বাজারে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সুতি ও রেশম বস্ত্র, দামি পাথর, হাতির দাঁতের জিনিসপত্র, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ইত্যাদি মসলা যথেষ্ট চাহিদা ছিল। প্রাচ্যের সম্পদের লোভে ইউরোপের বিভিন্ন বণিক জাতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আসে এবং ক্রমে শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয়। সরকার পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়ে এই দুই দেশের ১৯ শতকের শেষের ৩ দশকেও যথেষ্ট দাপটের সঙ্গে উপনিবেশিক সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পেরেছিল।

(৩) আধুনিক দুই সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল ইতালির জার্মানি, যারা অনেক পরে উপনিবেশ দখলের প্রতিযোগিতায় নাম লিখেছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাঁচার মতো স্থান এর তথ্য প্রচার করে জার্মান রাষ্ট্রপ্রধান হিটলারের উপনিবেশ স্থাপনের নীতি কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই দুই দেশের উপনিবেশিক নীতি ছিল সম্পূর্ণরূপে পেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল।

(৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে উপনিবেশিক শাসনের আবাসনের মধ্যে বহু স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে এসব দেশের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কোন বৃহৎ যুদ্ধের পরবর্তীতে এই দুই দেশের উপনিবেশ নীতি মূলত রাষ্ট্রীয় আদর্শের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ বিশ্বের রুশো সাম্যবাদী আদর্শ এবং মার্কিন পুঁজিবাদী আদর্শ কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে তা নিয়ে এই দুই দেশ সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা গ্রহণ করে।

২. নীতিসমূহ

(১) ইংল্যান্ডের : ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ইংল্যান্ডে বিশ্বের সর্বাধিক উপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সামুদ্রিক অভিযান ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রথমদিকে স্পেন ও পর্তুগালের তুলনা ইংল্যান্ড পিছিয়ে থাকলেও পরবর্তীকালে তারা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে। যদিও উপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে হল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন এদের সঙ্গে প্রায় এখন সময়ে ইংল্যান্ডের পথ চলা শুরু হয়। কিন্তু এদের সকলেরই উপনিবেশ অস্তা চলে গেলেও ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশ গুলি অস্তিত্ব বহুদিন বজায় থাকে। তাই বলা হত -“ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত্র যায় না।” ব্রিটিশ ঔপনিবেশ গুলি দু ধরনের রূপ ছিল।

একদিকে ছিল কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড মতো সাদা চামড়ার মানুষের ওপরে কায়েম হওয়া ব্রিটিশ উপনিবেশ। অপরদিকে ছিল ভারতসহ এশিয়া আর বিভিন্ন দেশ ও আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সাদা চামড়ার মানুষদের পূর্বপুরুষদের অনেকেরই আদিবাসভূমি ইংল্যান্ড বা ইউরোপের অন্য কোন দেশ হওয়ায় তাদের প্রতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অত তীব্র ছিল না যতটা ছিল কালো চামড়া মানুষদের ব্রিটিশ উপনিবেশ গুলিতে।

(২) ফ্রান্সের : নৌশক্তিতে বলিয়ান ফ্রান্স ও উপনিবেশ বিস্তারের দিক থেকে ইংল্যান্ডের প্রায় সমকক্ষ ছিল। ফ্রান্স সে সময় বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহৎ উপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আবিষ্কার যুগের স্পেন ও পর্তুগিজয়ের সাফল্যের উৎসাহিত নিয়ে ফ্রান্স উত্তর আমেরিকার ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং ভারতে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে সর্ববৃহৎ শক্তি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। উপনিবেশ বিস্তারের ব্যাপারে অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল ফ্রান্স।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় ইংল্যান্ডের তুলনায় ফ্রান্স অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। তবে উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে ফ্রান্স পুনরায় উপনিবেশ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ফ্রান্স দূরপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতে সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে। বিসমার্কের রচনায় ফ্রান্স আফ্রিকা বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্রাজ্য শুরু করে। দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতান্ত্রিক সরকার সাম্রাজ্যবাদী বিদেশ নীতি গ্রহণ করে। তৃতীয় নেপোলিয়নের আমলে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ নতুন উদ্যম লাভ করে।

(৩) ইতালির : উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিযোগিতা ইতালির অনেক পরে নাম লেখায়। ইতালি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তারে লিপ্ত হয়নি। এই ক্ষেত্রে ইতালি জাতীয় মর্যাদা বিস্তারিত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ইতালি উপনিবেশিক নীতিতে বলা হয় আধুনিক জীবনের আবশ্যিক প্রয়োজন হল জাতীয় মর্যাদা রক্ষা ও তার প্রসার। মূলত জার্মান রাষ্ট্রনায়ক বিসমার্কের মদতে ফ্রান্স টিউন এশিয়ার দখল নিয়ে ইতালি ফ্রান্স বিরোধ বাঁধে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে। এরপর থেকেই ইতালি উপনিবেশিক ও বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তারে নিয়োজিত হয়।

(৪) জার্মানি : জার্মানির সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। জার্মানির সাম্রাজ্যবাদের প্রথমও শেষ কথা ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন। বিসমার্ক আদতে সাম্রাজ্যবাদের প্রসারে অপেক্ষা জার্মানির ঐক্য গঠন অধিক আগ্রহী ছিলেন। মিস মার্কের পরে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম বিসমার্কের Realpolitik নীতির পরিবর্তে Weltpolitik নীতি গ্রহণ করেন। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় জার্মানিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দ্বিতীয় উইলিয়াম এক শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলেন।

(৫) রাশিয়ার : রাশিয়ার অনেক পরে উপনিবেশ বিস্তার বা ফ্রান্সের উপনিবেশিক নীতিগুলি সঙ্গে রাশিয়ার ঔপনিবেশিক নীতির কোনো রকম মিল ছিল না। মূলত উনিশ শতকের মধ্যবিত্ত সময়কাল নাগাদ রাশিয়ার ঔপনিবেশিক বিস্তারের লড়াইয়ে নামে। রাশিয়ার সমুদ্র পাহাড়ি দিয়ে বহু দূরে সোভিয়েতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখান নি। রাশিয়া মূলত নিজের লাগোয়া এলাকায় সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হয়েছিল। মধ্য এশিয়া এবং সাইবেরিয়া অঞ্চল জুড়ে রুশো সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটেছিল। মূলত রাজনৈতিক আধিপদ্ম স্থাপনের লক্ষ্যের সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত হয়।

(৬) আমেরিকা : অনেকদিন আগে থেকেই ইউরোপের মূলধন দক্ষিণ আমেরিকায় নিয়োজিত হয়। বহু ইউরোপীয় বাঁশি ও আমেরিকা দক্ষিণ আমেরিকা ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপন আটকানো লক্ষ্যে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের মনরো নীতি ঘোষণা করে। রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আমেরিকা সামোয়া দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপিনস দ্বীপপুঞ্জ, গুয়াম ও ক্যারোলাইন দ্বীপপুঞ্জ দখল করে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়ায় দ্বীপে নৌ ঘাঁটি নির্মাণ করে।

মন্তব্য

ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপনিবেশিক নীতি প্রকৃতি বা চরিত্র ছিল আলাদা আলাদা। কোন দেশ চেয়েছিল উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে। আবার কোন দেশ উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে অন্য দেশকে নিজের সাম্রাজ্য ভুক্ত করে বিশ্বে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল। আবার আসিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলি চেয়েছিল উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে নিজে নিজে রাজনৈতিক মতাদর্শনের প্রসারণ ঘটাতে।

উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস বইয়ের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর

Leave a Comment