কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের পরিচয়
কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রের বর্ণনায় ‘সপ্তাঙ্গিক রাজ্যম’— শব্দ দুটির উল্লেখ রয়েছে। সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব অনুযায়ী রাজ্য বা রাষ্ট্র সর্বসমেত ৭টি অঙ্গ বা উপাঙ্গ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি অঙ্গ হল- স্বামী, অমাত্য, জনপদ, পুর, কোশ, দণ্ড এবং মিত্র। এই সাতটি অঙ্গকে তিনি রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল一
[1] স্বামী: কৌটিল্য স্বামী বলতে রাজা অর্থাৎ রাজ্যের প্রধানকেই বুঝিয়েছেন। এই স্বামী অর্থাৎ রাজার কর্তব্যের উল্লেখে তিনি রাজার চারটি গুণাবলির প্রয়ােজনীয়তার কথা বলেছেন, যথা一
- অভিগামিক গুণ: সত্যনিষ্ঠা, ধর্মপরায়ণ, বিনয়, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি হল অভিগামিক গুণ।
- প্রজ্ঞাপন: দ্রুত কোনাে সমস্যা সঠিকভাবে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা, সঠিক কাজ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হল প্রজ্ঞাপন।
- উত্থান গুণ: সাহস এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার ক্ষমতা হল এই গুণের লক্ষণ।
- আত্ম সম্পদ: বাগ্মিতা, ইন্দ্রিয় সংযম, স্মৃতিশক্তি, বিপদকালে অবিচলিত থাকা এই সমস্ত গুণ হল আত্মসম্পদ।
[2] অমাত্য বা মন্ত্রী: কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের কর্মচারী বা অমাত্য এবং তাদের নিয়োগ পদ্ধতি, দায়িত্ব ও কর্তব্য আলােচনা করেছেন। অর্থশাস্ত্র অনুসারে এরকম কয়েকজন কর্মচারী হলেন—পুরােহিত, সমাহর্তা, সন্নিধাতা, কোশাধ্যক্ষ, রাজদূত, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারক প্রমুখ। অমাত্যের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হল কোনাে কাজ শুরু করার আগে তার নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা। কৌটিল্য বলেছেন—“অমাত্য অবশ্যই দেশীয় হবেন এবং স্বামী (প্রভু)র প্রতি গভীর অনুরক্ত থাকবেন।”
[3] জনপদ: জনপদ বলতে কৌটিল্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও তার অধিবাসীদের বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন জনবিহীন জনপদ অর্থহীন। তিনি আদর্শ ভূখণ্ড বলতে উর্বরভূমি, প্রচুর অরণ্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ বিশিষ্ট অঞ্চল এবং উৎকৃষ্ট মানের গােচারণভূমিকে বুঝিয়েছেন। কৌটিল্য বলেছেন, প্রতিটি গ্রামে কমপক্ষে একশত এবং সর্বাধিক পাঁচশত পরিবার বসবাস করবে।
[4] দুর্গ: কৌটিল্যের মতে দুর্গুলি সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৌটিল্য চার ধরনের দুর্গের কথা বলেছেন। এগুলি হল一
- জলদুর্গ: চারিদিকে জলবেষ্টিত এলাকা নিয়ে গঠিত দুর্গ হল জলদুর্গ।
- গুহা বা পার্বত্য দুর্গ: চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা বা পাহাড়ের মধ্যে তৈরি হয়—এই ধরনের দুর্গ।
- মরুদুর্গ: মরুপ্রান্তর সংলগ্ন দুর্গগুলির নাম ছিল মরুদুর্গ।
- বনদুর্গ: বনাঞ্চলে প্রতিরক্ষার প্রয়ােজনে স্থাপিত দুর্গের নাম ছিল বনদুর্গ।
[5] কোশ : কৌটিল্যের মতে রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে কোশ বা রাজার আর্থিক ক্ষমতার ওপর। কোশ হল এমন এক অর্থভাণ্ডার যা রাজা রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে উপার্জন করেন অথবা অন্য কোনাে সৎ উপায়ে সংগ্রহ করেন। অর্থের কয়েকটি উৎস হল প্রজাদের ওপর আরােপিত ভূমিরাজস্ব, চাষিদের থেকে সংগৃহীত শস্যকর, সেচকর, ব্যাবসাদারদের থেকে আদায়িকৃত পণ্যকর প্রভৃতি।
[6] দণ্ড : কৌটিল্যের মতে দণ্ড বা বল অর্থাৎ সেনাবাহিনীর ওপর রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। তার ধারণায় সেনারা রাজার ইচ্ছায় পরিচালিত হবে এবং রাজার নির্দেশ মতাে কাজ করবে। দণ্ড বা বল শব্দ দ্বারা মূলত হস্তী, অশ্ব, রথ এবং পদাতিক এই চতুরঙ্গ সেনাদের কথা বলা হয়েছে।
[7] মিত্র: সপ্তাঙ্গর শেষ উপাদানটি হল মিত্র বা সুহাদ (ally)। কৌটিল্যের ধারণায়, মিত্র হল সেই, যার কাছ থেকে বিপদের কোনাে সম্ভাবনা থাকে না| আর-এক দিক থেকে মিত্র বা সুহূদ শব্দটি বিজিগীষু (জয় করতে ইচ্ছুক) রাজাদের সঙ্গে মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধকারীদের বােঝানাে হয়েছে। কৌটিল্য দু ধরনের মিত্রের কথা বলেছেন一
- সহজ (Sahaja): পিতামহ ও পিতার সময়কাল থেকে যে ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে তারা হল সহজমিত্র।
- ক্রিত্রিম (Kritrima): এই ধরনের মিত্র হল অর্জিত মিত্র। এই ধরনের মিত্রতা স্বাস্থ্য, সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা দেয়। কৌটিল্যের মতে—সহজমিত্ৰতা কৃত্রিমের চেয়ে উৎকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ।